রংপুরের চার খুনের তদন্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে পদে পদে বিতর্ক
- আপডেট সময় : ১২:১৪:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

রংপুরের মাছুয়াপাড়ার চার খুনের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা পদে পদে প্রশ্নবিদ্ধ। গত ২১শে আগস্ট ভোরে মাছুয়াপাড়ার নিজ বাসার দ্বিতীয় তলায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২) শ্বাসরোধে নৃশংসভাবে খুন হন। ঘটনার পর ২২শে আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা তালাবদ্ধ বাসার দরজা ভেঙে পচন ধরা মরদেহগুলো উদ্ধার করে। গণপতির লাশ ছাদে, স্ত্রী ও মেয়ের লাশ সিঁড়িতে এবং ছোট ছেলে প্রিয়মের লাশ শোয়ার ঘরের খাটের নিচে পাওয়া যায়।
ঘটনার পর ২৩শে আগস্ট গভীর রাতে পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে স্থানীয় যুবক মুগ্ধ দাস (২৩) ও তার মামাতো ভাই সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটক করে। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার ডিআইজি আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার ব্যাখ্যাসহ তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে পুলিশের এই তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই জনমনে নানা প্রশ্ন ও রহস্য তৈরি হয়েছে। প্রথম দিকে পুলিশ হত্যাকাণ্ডটি গভীর বা শেষ রাতে হয়েছে বললেও, আসামিরা জবানবন্দিতে ভোর হওয়ার কথা জানায়। পরবর্তীতে পুলিশ কমিশনার তার আগের ভাষ্য পরিবর্তন করে জানান, হত্যাকাণ্ডটি দিনের আলো ফোটার সময় খোলা ছাদে ঘটেছে। এছাড়া গণপতির জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও সামাজিক জাতিগত দূরত্বের বিষয়ও হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তদন্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আরও বিতর্কের সৃষ্টি হয় যখন ছাদের আলামত ধুয়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে। ২৬শে আগস্ট রাতে পুলিশ পাহারায় থাকা অবস্থায় বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে পানির মোটর চালিয়ে ছাদ ও সিঁড়ি ধুয়ে ফেলার অভিযোগ করেন আসামি সিদ্ধার্থের বড় ভাই পার্থ দাস। পুলিশ তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছে তারা ভুলবশত লাইটের সুইচের পরিবর্তে মোটরের সুইচ দেয়ায় পানি উপচে পড়ে। তবে পার্থের দাবি, পুলিশ পরিকল্পিতভাবে আলামত নষ্ট করেছে। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ এড়াতে আসামিরা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করেছে বলে পুলিশ দাবি করলেও নেসকো জানিয়েছে তারা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করেনি।
ফরেনসিক রিপোর্টে ধর্ষণের কোনো আলামত না মিললেও, ডোম ৭১ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাশে বীর্য পাওয়ার দাবি করলে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়। ফরেনসিক চিকিৎসক জানান, শ্বাসরোধে মৃত্যু হলে সিমেন নির্গত হওয়া স্বাভাবিক, যা ডোম ভুল বুঝেছেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসিড দিয়ে মুখ ঝলসে দেওয়া বা কোপানোর গুজব ছড়িয়েছিল, কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্টে লাশে কোনো এসিডের অস্তিত্ব বা রক্ত পাওয়া যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে আসামিদের একই ধরনের শার্ট পরা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, আড়ং জানিয়েছে তাদের স্টকে এ ধরনের শার্ট নেই।
তদন্তের এক পর্যায়ে ২৯শে আগস্ট সাংবাদিক সেলিম সরকারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার জেরে আসামি সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও ভাই পার্থ দাসকে ডিবি পুলিশ আটক করে। পরে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে পুলিশের তড়িঘড়ি সংবাদ সম্মেলন, কমিশনারের কান্না এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের চেয়ে আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা তদন্তের পেশাদারিত্বকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাস রাজসাক্ষী হিসেবে মুগ্ধ দাসের স্বীকারোক্তির কথা জানালেও, পুলিশের স্ববিরোধী অবস্থান ও অসংলগ্ন বক্তব্য তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতাকে সংকটে ফেলেছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।



























