৬ দেশের পাসপোর্টধারী সাবেক আইজিপি বেনজীর এখন সেন্ট লুসিয়ায়
- আপডেট সময় : ০৯:৪৭:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

দুবাইয়ের আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বিতর্কিত সাবেক আইজিপি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি বেনজীর আহমেদ ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। গত ১৭ আগস্ট তিনি দুবাই থেকে সেখানে যান। ক্ষুদ্র এই দ্বীপরাষ্ট্রের পাসপোর্ট থাকার পাশাপাশি সেখানে তার যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে এবং সেন্ট লুসিয়ার গ্রোস আইসলেট এলাকায় তার একটি ফ্ল্যাটও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের এই প্রভাবশালী ও দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তা গত ২৭ জুলাই দুবাইয়ের একটি আদালত থেকে জামিন পান এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই কারামুক্ত হন। এর আগে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত নথির ভিত্তিতে দুবাইয়ের আদালতে উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি হয়, যার পর আদালত তাকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেয়। তার জামিন নিশ্চিত করতে ইউরোপের একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা দুবাইয়ের বিভিন্ন চ্যানেলে জোর লবিং করেছিলেন। তার জামিন ও কারামুক্তির খবরে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হইচই পড়ে যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
কারাগার থেকে বের হওয়ার পর বেনজীর দুবাই থেকে কোনো নিরাপদ দেশে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। স্পেনসহ কয়েকটি দেশে যাওয়ার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত বেশি সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি সেন্ট লুসিয়াকেই বেছে নেন। সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া এক ডিআইজি, যিনি বেনজীর ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান যে জামিনে মুক্তির পর বেনজীর তৃতীয় দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সেন্ট লুসিয়ায় পৌঁছেছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান শুরু হলে ২০২৪ সালের মে মাসে গোপনে দেশ ছাড়েন বেনজীর। এরপর গত ১২ জুন নাটকীয়ভাবে দুবাই পুলিশের হাতে তার গ্রেপ্তারের খবর বাংলাদেশ পুলিশের কাছে আসে। দুবাই পুলিশ ইমেইলের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখাকে বিষয়টি জানায় এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে তার গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেন। বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও কূটনৈতিক ও নানামুখী চ্যানেলে যোগাযোগ করে তাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সরকার। দুবাই পুলিশের অনুরোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২৪৪ পৃষ্ঠার একটি নথি পাঠানো হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যাশা পূরণ না করে গত ২৭ জুলাই দুবাইয়ের আদালত তার জামিন মঞ্জুর করে।
বেনজীরের বর্তমান অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) শাহদাত হোসাইন জানান, আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাও বেনজীরের সেন্ট লুসিয়ায় যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, তারা বিষয়টির খোঁজখবর নিচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে বলেন, সাবেক আইজিপির জামিন ও অন্য দেশে চলে যাওয়ার খবর তাকে আইনের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দুবাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকায় শুরু থেকেই তাকে ফেরত আনা নিয়ে সংশয় ছিল। তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় ভেতরের প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। এখন তাকে দেশে ফেরাতে হলে সরকারকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে অত্যন্ত জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের কাছে মোট ছয়টি দেশের পাসপোর্ট রয়েছে। আইজিপি পদে থাকাকালেই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তিনি তুরস্ক, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সেন্ট লুসিয়ার পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন। সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেও নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী দেখিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এছাড়াও দুবাইয়ে তিনি বাড়ি কেনাবেচা, রেস্টুরেন্ট ও গাড়ির বিশাল ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর বন্ধু শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি এই ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, পুনরায় জামিন বাতিল ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় বেনজীরের দুবাইয়ে ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম। বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের আতঙ্কে থাকা এই সাবেক আইজিপি এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে আত্মগোপনে চলে যেতে পারেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ০৪আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ৩১


























