সিএমএসএমই খাতে ঋণপ্রবাহে বড় ধস, বিপাকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা
- আপডেট সময় : ১২:১৬:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে

দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাত বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতে ঋণস্থিতি যেভাবে কমেছে, তা নিকট অতীতে দেখা যায়নি। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে এই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কোয়ার্টারলি রিপোর্ট অন সিএমএসএমই ফাইন্যান্সিং’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই খাতে ঋণস্থিতি ছিল ৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা ১৬ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা বা ৫.১৫ শতাংশ কমে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৮০৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বছরের প্রথম তিন মাসে এই খাত সম্প্রসারিত হওয়ার বদলে সংকুচিত হয়েছে। শুধু আগের প্রান্তিকের তুলনায়ই নয়, ২০২৫ সালের মার্চে থাকা ৩ লাখ ২ হাজার ১৭৪ কোটি টাকার ঋণস্থিতির তুলনায়ও বর্তমানে এই খাত পিছিয়ে আছে।
দেশের জিডিপিতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রাখা এবং কৃষিবহির্ভূত কর্মসংস্থানের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ যোগান দেওয়া এই খাতে অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সারাদেশে ১ কোটি ১০ লাখেরও বেশি সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার ৭০ শতাংশই ঢাকার বাইরে অবস্থিত। ফলে আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নে এই খাতের বিকাশ অপরিহার্য বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনের জন্য এই খাতের বিকাশে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
জাতীয় এসএমই নীতি অনুযায়ী, এ বছর মোট ঋণের ২৫.৫০ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্য থাকলেও মার্চ শেষে তা মাত্র ১৫.৮৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তা ঋণ (লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, অর্জন ৭.২৮ শতাংশ) এবং ক্লাস্টারভিত্তিক ঋণের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। একই সময়ে এই খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২৬.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ২৪.০৩ শতাংশ। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে ইসলামী ব্যাংকগুলো (খেলাপি ৪৩.৯৭ শতাংশ) এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো (খেলাপি ৪২.৭৩ শতাংশ)।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, মোট সিএমএসএমই ঋণের ২৪.০৯ শতাংশ গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের কাছে রয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে গ্রামীণ অঞ্চলের ১ লাখ ১৫ হাজার ৬০৪টি প্রতিষ্ঠানে ১২ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। তবে সামগ্রিক ঋণস্থিতি কমে যাওয়ায় গ্রামীণ বাজার, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ক্ষুদ্র উৎপাদন এবং স্থানীয় ব্যবসায় অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঋণ বিতরণ কমায় বেকারত্ব বাড়ার শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও এই ঋণে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম, যা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৫২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা সিএমএসএমই ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা বিতরণ করে শীর্ষস্থানে রয়েছে। শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে আরও রয়েছে পূবালী, সিটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, যারা সম্মিলিতভাবে মোট বিতরণের ৪০ শতাংশ ঋণ দিয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আইডিএলসি, লংকাবাংলা, আইপিডিসি, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স ও অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স শীর্ষে রয়েছে, যারা মোট ২ হাজার ৭ কোটি টাকা বিতরণ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহ কম থাকায় অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে, যার বড় অংশ সিএমএসএমই ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বড় ঋণগ্রহীতারা নানা সুবিধা পেলেও ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংকিং শর্ত পূরণে আগ্রহী হন না। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে কম সুদের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম জোরদার এবং জামানতহীন ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধা সহজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।





























