পর্যাপ্ত মজুত সত্ত্বেও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দেশের দেড় কোটি মানুষ
- আপডেট সময় : ০৪:৫৭:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে

দেশে সরকারিভাবে খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও আয়-সক্ষমতার অভাব, ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে প্রায় এক কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সূচক ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন’ (আইপিসি)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এই চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় চার লাখ ৮৩ হাজার মানুষ জরুরি পর্যায়ের মারাত্মক খাদ্য সংকটের মুখে রয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে ভুক্তভোগীর সংখ্যা এক কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক কর্মশালায় এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়, যা খাদ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার, সেভ দ্য চিলড্রেন ও গেইনের যৌথ উদ্যোগে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওর অঞ্চল, উপকূলীয় জেলা এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার সবচেয়ে বেশি।
খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানান, সরকার প্রমাণভিত্তিক এই বিশ্লেষণকে নীতি ও বিনিয়োগের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা বলেন, এই প্রতিবেদন লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, এফএও প্রতিনিধি ড. জিয়াওকুন শি দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে কৃষি ব্যবস্থার সহনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২৩ জুলাই পর্যন্ত সরকারি গুদামে চাল, গম ও ধান মিলিয়ে মোট ২৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৩ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৬০ হাজার ৭৪৬ টন চাল, দুই লাখ ৯৫ হাজার ৬৮৯ টন গম এবং এক লাখ ৬৮ হাজার ৬০৫ টন ধান। খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জামাল হোসেন জানান, নিরাপদ মজুতের সর্বনিম্ন সীমা ১৬ লাখ টন হলেও বর্তমানে তার চেয়ে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন বেশি মজুত রয়েছে। এছাড়া গত অর্থবছরে বোরো মৌসুমে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৩১ টন ধান-চাল সংগৃহীত হয়েছে এবং নতুন অর্থবছরের প্রথম ২৩ দিনে তিন লাখ ২০ হাজার ৮০০ টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। খাদ্য সংরক্ষণাগারের বর্তমান ক্ষমতা ২৭ লাখ টন, যা আগামী পাঁচ বছরে ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মজুত থাকা সত্ত্বেও সংকটের এই বৈপরীত্য মূলত বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে প্রান্তিক মানুষের সংযোগহীনতার প্রতিফলন। দুর্গম যোগাযোগ, মৌসুমি বন্যা ও সীমিত আয়ের কারণে এই জনগোষ্ঠী খাদ্যবাজারের সুবিধা নিতে পারছে না। বিশ্বজুড়েও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে; গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস (জিআরএফসি) ২০২৬ অনুযায়ী, গত এক দশকে বিশ্বে তীব্র ক্ষুধা দ্বিগুণ হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো একই বছরে দুটি স্থানে—গাজা ও সুদানের কিছু অংশে—দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের ৪৭টি দেশে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন, যা ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর তীব্র অপুষ্টির শিকার হওয়ার পরিস্থিতির সাথে যুক্ত। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন—এই ১০ দেশই বিশ্বের তীব্র ক্ষুধায় থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশের আবাসস্থল। ডব্লিউএফপির কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামা জানান, আইপিসি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংকট গভীর হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।



























