ঢাকায় বোমাসদৃশ বস্তু ও বিস্ফোরক উদ্ধার: নেপথ্যে কারা, চলছে তদন্ত

- আপডেট সময় : ০৬:০৫:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর মতিঝিল, মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন এবং সাভারের আশুলিয়ায় কয়েকদিনের ব্যবধানে বোমাসদৃশ বস্তু ও শক্তিশালী বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিল ও আশুলিয়ার ঘটনায় প্রকৃত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেটে পাওয়া সন্দেহজনক বস্তুগুলো পরীক্ষা করে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি বিশেষ উদ্দেশ্যে মহল বিশেষ পরিকল্পিতভাবে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর অপচেষ্টা করছে।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, মতিঝিল ও আশুলিয়ার বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সিটিটিসিসহ পুলিশের একাধিক টিম তদন্ত করছে এবং জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, গ্রেফতারের পরই তাদের উদ্দেশ্য ও নাশকতার কারণ স্পষ্ট হবে। তিনি আরও জানান, যে কোনো ধরনের নাশকতা মোকাবিলায় সিটিটিসি সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে এবং উগ্রবাদী ও অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। দুষ্কৃতিকারী চক্র জনমনে ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতেই এ ধরনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। পুলিশ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে ১ থেকে ১.৫ কেজি ওজনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাইপ বোমা উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিট। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করার সময় এক পথচারী আহত হন। এর ছয়দিন পর, ৩০ জুলাই রাতে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদি দোকানে ট্রাভেল ব্যাগের ভেতর রাখা প্রেসার কুকারে তৈরি আইইডি উদ্ধার করা হয়, যা টাইমারযুক্ত ছিল।
শনিবার সকালে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু পাওয়া গেলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। পরে বোম ডিসপোজাল ইউনিট পরীক্ষা করে জানায়, মিরপুরে পাওয়া বস্তুটি ছিল পান-সুপারির কৌটা এবং ফার্মগেটে পাওয়া বস্তার ভেতর ছিল পরিত্যক্ত আবর্জনা। সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই দুটি ঘটনায় জননিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি ছিল না। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া আইইডির নির্মাণকৌশল, বিস্ফোরক উপাদান, টাইমিং ডিভাইস ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছেন।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে দেশে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা ঘরে বসেই আইইডি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাভার, কেরানীগঞ্জ ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে এসেছে যে, অভিযুক্তদের কেউ কেউ বিদেশে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। এছাড়া পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও লস্কর-ই-তৈয়বার (এলইটি) সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেফতারের ঘটনাও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও এনক্রিপটেড অ্যাপের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ ও মতাদর্শ প্রচারের ফলে ছোট ছোট গোপন ‘স্লিপার সেল’ নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, জঙ্গিবাদ এখন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। বড় ধরনের হামলা না হওয়াকে জঙ্গিবাদের অবসান হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। অনলাইন প্রচারণা, গোপন যোগাযোগ এবং ক্ষুদ্র নেটওয়ার্ক তৈরির প্রবণতা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। তিনি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে উগ্রবাদ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, বড় ধরনের হামলার সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে সব ধরনের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, যে কোনো আদর্শের আড়ালে উগ্রবাদ পরিচালিত হোক না কেন, তা মোকাবিলায় র্যাব কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি ও সাইবার মনিটরিং সার্বক্ষণিক চালু রয়েছে।

























