খাদ্যে ভেজালের থাবা: ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য ও আগামী প্রজন্ম
- আপডেট সময় : ০৩:০৪:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে

সকালের নাশতায় এক কাপ চায়ের সঙ্গে পাউরুটি খাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি চিত্র হলেও, সেই পাউরুটিই এখন হতে পারে প্রাণঘাতী রোগের কারণ। বর্তমানে দেশের বাজারে শিশুদের খাবার থেকে শুরু করে তেল, মসলা, দুধ, ফল ও শাক-সবজির মতো প্রায় প্রতিটি খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীরা শিল্পজাত রাসায়নিক, বিষাক্ত রং ও নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করে জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর হৃদরোগ, কিডনি রোগ, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগে প্রায় ৫ লাখ ৭২ হাজার মানুষ মারা যান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অতিরিক্ত চিনি, লবণ, চর্বি এবং ভেজালযুক্ত খাদ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এসব মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বিএসটিআই-এর তথ্যানুযায়ী, গত ১০ মাসে (২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল) ১ হাজার ৭৫৬টি খাদ্যনমুনা পরীক্ষা করে ৩৩.৪ শতাংশ বা ৫৮৬টিতে ভেজাল ও দূষণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস, শিশুখাদ্য, মরিচ-হলুদের গুঁড়া, ঘি, মধু ও সরিষার তেলের মতো পণ্যগুলোতে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সারফেস অ্যাকটিভের মতো নিষিদ্ধ রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। চিপসের ৬৫ শতাংশে পাওয়া গেছে ক্ষতিকর অ্যাক্রিলামাইড এবং ৮২টি খাদ্যপণ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি ডিডিটি ও বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া চালের ১৩টি নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক এবং পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসাসহ ভারী ধাতু এবং লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। এমনকি মুরগি ও মাছেও মিলেছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োট ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক।
যদিও বিএফএসএ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআই নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে, তবুও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। সম্প্রতি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের দায়ে বিএফএসএ তিনটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইস্ট কেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড লিমিটেডের ‘ইস্ট কেক পুর পিঠা জ্যাম’, ইস্ট জিবাই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ‘ইস্ট বেকার স্লাইস ব্রেড মিল্ক জ্যাম’ এবং আরবোটিং ফুড কোম্পানি লিমিটেডের ‘আরবোটিং ফুড স্লাইস ব্রেড মিক্স জ্যাম’। এছাড়া রাজধানীর রায়েরবাগ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, কেরানীগঞ্জ, ডেমরা ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ভেজাল খাদ্য উৎপাদনের অসংখ্য কারখানা। এমনকি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মোড়ক নকল করে ভুসি ও চালের কুড়া দিয়ে ওটস তৈরির মতো জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে।
অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও শাস্তির স্বল্পতাকে ভেজাল প্রতিরোধের প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কনজ্য কনজ্য কনজ্য কনজ্য কনজ্য কনজ্যুমার এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি এস এম নাজের আহমেদ জানান, জরিমানা অপরাধের তুলনায় নগন্য হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ভয় পাচ্ছে না। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুব কবির মিলন মনে করেন, সংস্থাটির স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা ও পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা না থাকা এবং সরকারি দপ্তরে সমন্বয়ের অভাব এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। বিএসটিআই-এর পরিচালক মো. সাইফুল ইসলামও স্বীকার করেছেন যে, জনবলের সংকট এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বারবার একই অপরাধ করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে।
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান নিউট্রোলোজিস্ট শামসুন নাহার মহুয়া সতর্ক করে বলেছেন, সুস্থ থাকতে হলে অস্বাস্থ্যকর ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন করে বাড়িতে তৈরি খাবারের অভ্যাস গড়তে হবে। জনস্বাস্থ্যের এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও তদারকি জোরদার করার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

























