এডিপি বাস্তবায়নে রেকর্ড ধস: স্বাস্থ্য খাতেই অলস পড়ে আছে ২১৫৪ কোটি টাকা

- আপডেট সময় : ০৮:৪৫:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

দেশের উন্নয়ন ইতিহাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে রেকর্ড ধস নেমেছে। সদ্য বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৭.৫২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। সরকারের এই উন্নয়ন কার্যক্রমে অদক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্য খাতে। এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ থাকা ৩ হাজার ১২৮ কোটি ৪১ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯৭৪ কোটি টাকা। ফলে অদক্ষতার কারণে এ খাতের ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা অলস পড়ে রয়েছে।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এডিপি বাস্তবায়নের এমন নজিরবিহীন নিম্নহার সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। সময়মতো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো, কৃষি, জ্বালানি ও পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা মাত্র ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে। এটি গত ৫০ বছরের মধ্যে এডিপি বাস্তবায়নের দুর্বলতম চিত্র। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরের পর এবারই উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ সবচেয়ে কম ছিল। গত কয়েক বছর ধরেই এডিপি বাস্তবায়নের গতি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ছিল ৯২.৭৪ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫.১৭ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০.৬৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮.১৮ শতাংশে নেমে আসে। সর্বশেষ অর্থবছরে তা আরও কমে ৬৭.৫২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা টানা পাঁচ বছর ধরে নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় রেখেছে।
অর্থবছরের শেষ মাস জুনে তড়িঘড়ি করে ৪০ হাজার ৩০৮ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যা সংশোধিত এডিপির ১৯.২৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরের জুনে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪৩,১৮৯ কোটি ১০ লাখ টাকা (১৯.৯১ শতাংশ)। আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরে সরকারের ৮টি প্রতিষ্ঠান সংশোধিত এডিপির ৪০ শতাংশের নিচে বরাদ্দ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের, যেখানে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে এক বছরে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা (বাস্তবায়ন হার ৭.৫০ শতাংশ)।
এছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) মাত্র ১৩.৯৭ শতাংশ (বরাদ্দ ৬৯.৮২ কোটি, ব্যয় ৯.৭৬ লাখ টাকা), অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ১৭.৪২ শতাংশ (বরাদ্দ ৫৯৪.৮৬ কোটি, ব্যয় ১০৩.৬৪ কোটি টাকা) এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ২৯.৯০ শতাংশ (বরাদ্দ ৫৫৭.৭৫ কোটি, ব্যয় ১৬৬.৭৮ কোটি টাকা) বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশার পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৩২.৬৯ শতাংশ, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ৩২.৪৫ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ৩৬.৭২ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে। আইএমইডির কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বজায় ছিল। অনেক প্রকল্পের পরিচালক ও ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যাওয়া এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা কর্মকাণ্ডে মনোযোগের ঘাটতি থাকায় উন্নয়ন ব্যয়ের এই নজিরবিহীন ধস নেমেছে।
এর পরে রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাস্তবায়নের হার ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ৬৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বাস্তবায়নের হার ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। বরাদ্দ ৫৯৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১০৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বাস্তবায়ন হার ২৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। ৫৫৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১৬৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।


























