জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা ও গরুর মাংস ঘিরে রাজনীতির বিশ্লেষণ
- আপডেট সময় : ০৫:২৯:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের স্নাতক পাঠ সম্পন্ন করা উপলক্ষ্যে আয়োজিত খাওয়াদাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বিতর্ক ও আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছে ক্যাম্পাসটি। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা অস্থায়ী মন্দিরের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেছিলেন। সে সময় রান্না করা ও চুলা তৈরিতে মন্দিরের ইট ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলে আয়োজকেরা সেগুলো সরিয়ে নেন এবং নিজেদের অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টি তখনই নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছিল।
তবে সেই সাধারণ ঘটনার সেখানেই ইতি ঘটেনি; বরং পরবর্তীতে এটিকে ‘গরুর মাংস খাওয়ার অধিকার’-এর আন্দোলনে রূপ দেওয়া হয়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) বিক্ষোভ সমাবেশ ডেকে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে গরু জবাই ও ভোজের কর্মসূচি ঘোষণা করে। শুরুতে সার্বিক জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার কারণ দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধের নির্দেশনা জারী করলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপের মুখে নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু হটে এবং দুঃখ প্রকাশ করে। ফলে ঘোষিত দিন শুক্রবারেই সেই গরু জবাইয়ের কর্মসূচি পালন করা হয়।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় শনিবার দ্বিতীয় দফায় আবারও গরু জবাই, ভোজ ও কাওয়ালি সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। তবে এই দ্বিতীয় কর্মসূচিটি জকসুর ব্যানারে নয়, বরং বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রক্টরের তথ্যমতে, প্রশাসন প্রথমে অনুমতি দিতে অসম্মতি জানালেও সংগঠনটির এক শীর্ষ নেতা সরাসরি উপাচার্যকে টেলিফোন করার পর শর্তসাপেক্ষে সভার সম্মতি দেওয়া হয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজেদের নীতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়ে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ রূপ ধারণ করেছে এবং চাপের কাছে যুক্তি হেরে যাওয়ার বার্তা দিয়েছে।
গরুর মাংস খাওয়ার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও কোনো উপাসনাস্থলের কাছে তা রান্নায় আপত্তি—এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কেউ গরুর মাংস খেলে যেমন তিনি সাম্প্রদায়িক হয়ে যান না, তেমনি মন্দিরের পাশে রান্না নিয়ে আপত্তি তোলা মানেই কারো খাদ্যাভ্যাসে বাধা দেওয়া নয়। যেখানে মূল আয়োজকেরা ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়েছেন, সেখানে বারবার গরু জবাইয়ের মতো কর্মসূচির আয়োজন করা মূলত খাবারের অধিকারের বিষয় থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসে ক্ষমতার আধিপত্য প্রদর্শনের বিষয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘জিয়াফত’ নামে গরু জবাইয়ের কর্মসূচি দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদের নামে গরু জবাইকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া হয়। একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে ‘বাকশাল’ নাম দিয়ে একটি গরু জবাই করে ‘জুলাই জিয়াফত’ পালন করা হয়েছিল। প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে গরু জবাইকে রাজনৈতিক প্রতীক বানানো কোনো নিরীহ বিষয় নয়, বরং সামাজিক বিভেদ তৈরি করে ক্ষমতা প্রদর্শনেরই কৌশল।
সাম্প্রতিক সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কালি লেপে দেওয়া, সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে হত্যা এবং দুর্গাপূজার চলাকালে গরু জবাইয়ের একের পর এক কর্মসূচির পেছনে একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জড়িত না থাকলেও, এগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের দ্রুত অবক্ষয়কে চিহ্নিত করে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে যে সমাজে দিন দিন অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের পথ সংকুচিত হয়ে আসছে।
কয়েক বছর পূর্বে ভারতের কলকাতায় পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ বামপন্থী নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এক হিন্দু ব্রাক্ষণের গরুর মাংস খাওয়ার সেই ঘটনা রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি করলেও, তা ছিল ভারতে সংখ্যাগুরুদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি সাহসী প্রতিবাদ। তবে বাংলাদেশের বাস্তব প্রেক্ষাপট ভারতের সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশে গরু বিক্রি ও ব্যবহারে কোনো আইনি বা সামাজিক বাধা নেই; যেটুকু সংবেদনশীলতা রয়েছে তা সংখ্যালঘু অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে উদ্ভূত।
বর্তমানে দেশের একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী সেই সামাজিক বিবেচনাবোধ মুছে ফেলতে চক্রান্ত করছে। তারা সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসকে একটি ‘বিপন্ন অধিকার’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে কাল্পনিক সুরক্ষার নামে শক্তি প্রদর্শন করছে। এর ফলে তারা ভারতে গোরক্ষকদের রাজনীতির মতোই ভিন্ন মাত্রার একটি উল্টো রূপ হয়ে উঠছে। ভারতে গোরক্ষকেরা অন্যকে গরু খেতে বাধা দেয়, আর বাংলাদেশে বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে গরু জবাই করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠদের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার রাজনৈতিক চক্রান্ত স্পষ্ট। নিজেদের বিশ্বাস অনুসরণের পাশাপাশি অন্যের সমান অধিকার বজায় রাখা জরুরি; তাই সীমান্তের ওপারে ভারতের সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরোধিতা করতে হলে নিজ দেশেও সংখ্যালঘু সংবেদনশীলতা রক্ষা করা রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব।




























