বেসরকারি চাকরির নতুন বিধিমালা: সুরক্ষা দেবে, নাকি সুবিধা ছাঁটবে?
- আপডেট সময় : ১২:১৮:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত 'মডেল চাকরি প্রবিধানমালা' নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই খসড়াটি কি সত্যিই দেশের বিশাল এক কর্মীগোষ্ঠীকে আইনি সুরক্ষা দেবে, নাকি ঘুরপথে তাদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাই ছেঁটে ফেলবে? দেশের শ্রম আইন মূলত শ্রমিকদের সুরক্ষায় নিবেদিত, কিন্তু বেসরকারি কোম্পানি, ব্যাংক-বিমা, আইটি, এনজিও কিংবা সেবা খাতের লাখো কর্মকর্তা-কর্মচারী শ্রম আইনের ২(৬৫) ধারার সংজ্ঞার বাইরে থাকায় তারা এতদিন কোনো আইনি ছাতার নিচে ছিলেন না। এই শূন্যতা পূরণের উদ্যোগটি স্বাগত জানানোর মতো হলেও, এটি কতটা কর্মচারীবান্ধব হবে তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, যেমন লিখিত নিয়োগপত্র বাধ্যতামূলক করা, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কাঠামো তৈরি, ১২০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কালো তালিকাভুক্তি নিষিদ্ধ করা। তবে সমস্যা হলো এটি একটি 'মডেল' বা নির্দেশিকামাত্র, যা বাধ্যতামূলক নয়। এতে অতিরিক্ত সময়ের কাজের বাড়তি মজুরির স্পষ্ট উল্লেখ নেই, পিতৃত্বকালীন ছুটির কোনো বালাই নেই এবং উৎসব বোনাসকে 'সর্বোচ্চ এক মাস' হিসেবে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যা সুরক্ষার পরিবর্তে সুযোগের সীমা নির্ধারণের মতো। এছাড়া 'কর্মচারী' ও 'কর্মকর্তা'র সংজ্ঞা অস্পষ্ট থাকায় সবাইকে 'কনসালট্যান্ট' তকমা দিয়ে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
২০২৬ সালে শ্রম আইন সংশোধন এবং আইএলওর ১৫৫, ১৮৭ ও ১৯০ নম্বর কনভেনশন অনুসমর্থনের প্রেক্ষাপটে এই প্রবিধানমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখতে কর্মচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এই প্রবিধানমালাকে কেবল মালিকপক্ষের মতামতে চূড়ান্ত না করে কর্মচারী প্রতিনিধি, মানবসম্পদ পেশাজীবী ও গবেষকদের অংশগ্রহণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রূপ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে এটিকে মডেলের পরিবর্তে বাধ্যতামূলক প্রজ্ঞাপন হিসেবে জারি করা, পদবি নয় বরং কাজের ভিত্তিতে 'কর্মচারী'র সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং বারবার চুক্তি নবায়ন করে স্থায়ী হওয়ার পথ উন্মুক্ত করা। এছাড়া চুক্তি আইন, ১৮৭২ থাকবে সম্পূরক আইন হিসেবে, যার ২৭ ধারা অনুযায়ী চাকরি ছাড়ার পর প্রতিযোগীর কাছে না যাওয়ার শর্ত এমনিতেই অকার্যকর। বেতন ও আর্থিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে মূল বেতন ৫০-৬০ শতাংশ নিশ্চিত করা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, ওভারটাইমে দ্বিগুণ মজুরি এবং চাকরি অবসানে দ্রুত পাওনা পরিশোধের দাবি জানানো হয়েছে। ছুটির ক্ষেত্রে সপ্তাহে দুই দিন ছুটি, ১৫ দিনের পিতৃত্বকালীন ছুটি, ১০০+ কর্মীর প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার এবং কর্মঘণ্টার পর 'রাইট টু ডিসকানেক্ট'-এর মতো আধুনিক অধিকারগুলো যুক্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া আইএলও ১৫৮-এর চেতনায় কারণসহ লিখিত ও যাচাইযোগ্য চাকরিচ্যুতির বিধান রাখা জরুরি।
কর্মচারীবান্ধব মানেই মালিকবিরোধী নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের বৈধ অধিকারের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখা। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়মুক্তি ও নোটিশের সমতার মতো ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এই প্রবিধানমালা যেন কেবল এক পক্ষের সুবিধা না দেখে বরং একটি ন্যায্য সনদ হিসেবে গড়ে ওঠে, যাতে এটি কর্মচারীদের জন্য সুরক্ষার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, সিলিং হিসেবে নয়।





























