সৌদি আরব রক্ষায় পাকিস্তান কি সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে?
- আপডেট সময় : ০৮:৩১:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগর উপকূলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা কয়েক বছরের মধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য দেখিয়েছে। বাব আল-মানদেব প্রণালির নিকটবর্তী বৃহৎ ও ক্ষুদ্র হানিশ দ্বীপপুঞ্জ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর তারা এখন মোখা শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইয়েমেনের প্রায় এক দশক পুরোনো গৃহযুদ্ধ নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি মাত্র এক মাস আগে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা বাকি দুই দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। পাকিস্তান শুরু থেকেই এটিকে কেবল একটি আত্মরক্ষামূলক চুক্তি হিসেবে অভিহিত করে আসলেও বর্তমান পরিস্থিতি দেশটিকে এক বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি করেছে।
হুতিদের অগ্রযাত্রা রুখতে সৌদি আরব গত দুই সপ্তাহে তীব্র সামরিক অভিযান শুরু করেছে, যার মধ্যে মাত্র পাঁচ দিনেই প্রায় ৩০০টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সীমান্তের দুই পাশেই প্রাণহানি বাড়ছে এবং এই যুদ্ধের উত্তাপ সৌদি তেলের বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে গত ১৬ সেপ্টেম্বর, যখন মক্কা অভিমুখে ধেয়ে আসা একটি হুতি ড্রোন আকাশে ধ্বংস করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বের কারণে মক্কার ওপর যেকোনো হুমকিকে রিয়াদ তাদের সর্বোচ্চ লাল দাগ বা রেড লাইন হিসেবে বিবেচনা করে। এই ঘটনার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, মক্কা চুক্তি কার্যকর রয়েছে এবং পাকিস্তান তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এমন কড়া বক্তব্যের পরও Islamabad এখন পর্যন্ত সামরিকভাবে এই চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়নি। এর আগে ১০ সেপ্টেম্বরই পাকিস্তান স্পষ্ট করে জানিয়েছিল যে তারা তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে না, বরং কূটনীতিতেই মনোযোগ দেবে। এমনকি ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তুর্কি ও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে মক্কা চুক্তির আওতায় রিয়াদ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সামরিক সাহায্য চায়নি। বর্তমানে ওমান ও মিসর এই সংকট সমাধানে প্রধান gastronomic বা কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, তুরস্কের নিজস্ব আইনি জটিলতা রয়েছে; আগামী অক্টোবরের আগে দেশটির সংসদে এই চুক্তি অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে আঙ্কারার অবস্থান আপাতত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ঝুলে রয়েছে。
এই বিলম্বের কারণে সৌদি আরব নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিকল্প উপায় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। জানা গেছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের ওপর মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুই বার যোগাযোগ করেছেন। ট্রাম্প সরাসরি হামলায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালেও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া চুক্তির সহযোগীদের কাছ থেকে সময়মতো কার্যকর সাড়া না পেয়ে রিয়াদ এখন ইসরায়েল ও ব্রিটেনের দ্বারেও কড়া নাড়ছে বলে আলোচনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক স্টিভেন এ কুকের মতে, চুক্তির পর দৃশ্যমান কোনো সামরিক অগ্রগতি না হওয়ায় সই করার এক মাসের মধ্যেই এর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ইসলামাবাদ যেটিকে দায়িত্বশীল সংযম বলছে, রিয়াদের চোখে তা হয়তো একাকী ফেলে যাওয়ার শামিল।
অবশ্য পাকিস্তান যে একেবারেই নিষ্ক্রিয় রয়েছে, তা বলা যাবে না। চলমান সংকট শুরু হওয়ার অনেক আগেই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের প্রায় ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সেনাসদস্য সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির রিয়াদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করছেন। পাকিস্তান একদিকে যেমন রিয়াদের প্রতি তাদের প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে হুতিদের লাগাম টানতে তেহরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য এই চ্যানেলটি ব্যবহার করছে। পাকিস্তানের অবস্থান হলো—নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সৌদি ভূখণ্ডে সেনা মোতায়েন রাখা এক বিষয়, আর ইয়েমেনের ভেতরে গিয়ে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
পাকিস্তানের জন্য প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনো অবস্থাতেই ইয়েমেন সংকট যেন সৌদি-ইরান সরাসরি যুদ্ধের রূপ না নেয়, সেদিকে ইসলামাবাদের কড়া নজর রয়েছে। এই সংকট নিরসনে চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা কমাতে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল বেইজিং। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতাতেই সৌদি-ইরান কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলেছিল। বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বার্থে চীন আবারও এই সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে।
ইয়েমেন সংকটের একটি নিজস্ব অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে পাকিস্তানের জন্য। বাব আল-মানদেব প্রণালিটি সরাসরি আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে করাচি বন্দর, সিপেকের প্রধান কেন্দ্র গওয়াদর বন্দর বা পাকিস্তানের নিজস্ব সমুদ্রসীমা এই সংকট থেকে খুব বেশি দূরে নয়। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে পণ্য পরিবহন খরচ ও ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পায়, যা বিকল্প বাণিজ্যিক পথ হিসেবে গওয়াদর বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ালেও বিনিয়োগকারীদের মনে ঝুঁকি তৈরি করে।
ইসলামাবাদের জন্য আসল কঠিন পরীক্ষাটি তখন আসবে, যদি রিয়াদ ইয়েমেনের মাটিতে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নিতে পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করে। ইয়েমেনের ভেতরে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি দেশটির জন্য বড় ধরনের পাল্টা হামলার ঝুঁকি তৈরি করবে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ফাটল ধরাবে এবং দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেবে। এর ফলে পাকিস্তান এখন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যে কূটনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে, তা রাতারাতি বিলুপ্ত হবে। মক্কা চুক্তির আসল পরীক্ষা ইয়েমেনের মাটিতে সেনা নামানোর মধ্যে নয়, বরং যুগে না জড়িয়েও বর্তমানে মোতায়েন থাকা সামরিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি করতে পারার ওপরই নির্ভর করছে।
১০ সেপ্টেম্বরই পাকিস্তান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবছে না তারা; আপাতত নজর থাকবে কূটনীতিতেই।এমনকি ১৭-১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া তথ্যমতে, তুর্কি ও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন যে চুক্তির আওতায় রিয়াদ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সাহায্যই চায়নি।





























