ঢাকা ১০:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মঙ্গলে ৫০০০ দিন পার করে নতুন উপত্যকায় নাসার কিউরিওসিটি লালমনিরহাট কারাগারে ধারণক্ষমতার তিন গুণ বন্দি, তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি ইরানের বিমান চলাচলের ওপর সর্বাত্মক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী ও হিন্দু পরিবারের মেয়েদের অধিকার জাতিসংঘে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ৩ ঘণ্টার বৈঠক, নতুন আলোচনার ইঙ্গিত ট্রাম্পের ডিএসইর ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার জরিমানা মওকুফ চায় প্রাইম ফাইন্যান্স সচিবদের চেয়ে কম বেতন পাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী, সম্মানি বাড়ানোর উদ্যোগ টাঙ্গাইলে ভবঘুরে নারীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার অবসরের ইঙ্গিত দিলেন মেসির দীর্ঘদিনের সতীর্থ নিকোলাস তালিয়াফিকো নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কাছে সন্দেহজনক স্যুটকেস ঘিরে বোম আতঙ্ক

আওয়ামী লীগের ‘ডিসেম্বর তত্ত্ব’ ও বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৩:০০:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



রাজনীতিতে স্বপ্ন দেখা ইতিবাচক হলেও বাস্তবতার নদী পাড়ি দিতে সাঁতার জানা জরুরি। আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ে অনেকেই এখন এক অলীক রাজনৈতিক স্বপ্নে বিভোর। তাদের আশা, আগামী ডিসেম্বরেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। খোদ শেখ হাসিনাও ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন, যা তিনি আগস্টেও পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে এই ফেরার সমীকরণটি যতটা সহজ ভাবা হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও কঠিন।

এই বাস্তবতার বড় প্রমাণ মিলেছে ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজন শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য নেতারা হলেন বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। দীর্ঘদিন ধরে দলের অন্যতম নীতি-নির্ধারক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ নেতৃত্বের এই দণ্ড আওয়ামী লীগকে এক চরম আইনি ও নৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এর আগে স্বয়ং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে।

দলের একাংশ যখন 'ডিসেম্বরের ট্রেন আসবেই' বলে কর্মীদের আশ্বস্ত করছে, তখন ট্রেনের টিকিট, প্ল্যাটফর্ম কিংবা ইঞ্জিনের জ্বালানির মতো মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। ইতিহাসে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে পতন ঠেকানো না যাওয়ার বহু নজির রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে নাৎসি জার্মানির ২২ জন প্রধান নেতাসহ বহু কর্মকর্তার বিচার হয়েছিল, যেখানে 'উপরের নির্দেশ পালন' কোনো অজুহাত হিসেবে গৃহীত হয়নি। একইভাবে রোমান সাম্রাজ্য, ১৯৯১ সালে পরাক্রমশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট শাসকদের পতন প্রমাণ করে যে কোনো রাষ্ট্রক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা অবহেলিত জনক্ষোভই এক সময় বড় বিস্ফোরণের জন্ম দেয়, যার প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হন। এই রক্তাক্ত অধ্যায়কে কেবল একটি সাময়িক দুর্ঘটনা বা 'কমা' হিসেবে দেখার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগের একটি অংশ। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। নদীর পানি একবার সরে গেলে যেমন নতুন পানি আসে, তেমনি জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ বদলে গেলে পুরনো অবস্থানে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। অতি লোভে তাঁতি নষ্ট হওয়া কিংবা গাছের ডালে বসে গোড়া কাটার মতো ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত এখন দলটিকে দিতে হচ্ছে।

বর্তমান বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্য আমূল বদলে গেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন চাপের মুখোমুখি এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ। এই অবস্থায় শেখ হাসিনা যদি ডিসেম্বরে ফিরেও আসেন, তবে সেটি কোনো political বিজয় হবে না; romance-এর চেয়ে বেশি আইনি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা হবে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে আদালত, সাজা এবং রক্তাক্ত স্মৃতির মুখোমুখি হওয়াটা সহজ হবে না। নিহতদের পরিবারের কান্না, আহতদের ক্ষত এবং দেয়ালে লেখা স্লোগানের সামনে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে দাঁড়ানো অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত রাজনীতির সবচেয়ে বড় আদালত হলো জনগণের স্মৃতিশক্তি। তাই আওয়ামী লীগের জন্য এখন দিন গোনার চেয়ে নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডের গভীর আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবাই হবে একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

নিউজটি শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগের ‘ডিসেম্বর তত্ত্ব’ ও বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ

আপডেট সময় : ০৩:০০:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতিতে স্বপ্ন দেখা ইতিবাচক হলেও বাস্তবতার নদী পাড়ি দিতে সাঁতার জানা জরুরি। আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ে অনেকেই এখন এক অলীক রাজনৈতিক স্বপ্নে বিভোর। তাদের আশা, আগামী ডিসেম্বরেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। খোদ শেখ হাসিনাও ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন, যা তিনি আগস্টেও পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে এই ফেরার সমীকরণটি যতটা সহজ ভাবা হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও কঠিন।

এই বাস্তবতার বড় প্রমাণ মিলেছে ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজন শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য নেতারা হলেন বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। দীর্ঘদিন ধরে দলের অন্যতম নীতি-নির্ধারক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ নেতৃত্বের এই দণ্ড আওয়ামী লীগকে এক চরম আইনি ও নৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এর আগে স্বয়ং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে।

দলের একাংশ যখন 'ডিসেম্বরের ট্রেন আসবেই' বলে কর্মীদের আশ্বস্ত করছে, তখন ট্রেনের টিকিট, প্ল্যাটফর্ম কিংবা ইঞ্জিনের জ্বালানির মতো মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। ইতিহাসে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে পতন ঠেকানো না যাওয়ার বহু নজির রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে নাৎসি জার্মানির ২২ জন প্রধান নেতাসহ বহু কর্মকর্তার বিচার হয়েছিল, যেখানে 'উপরের নির্দেশ পালন' কোনো অজুহাত হিসেবে গৃহীত হয়নি। একইভাবে রোমান সাম্রাজ্য, ১৯৯১ সালে পরাক্রমশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট শাসকদের পতন প্রমাণ করে যে কোনো রাষ্ট্রক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা অবহেলিত জনক্ষোভই এক সময় বড় বিস্ফোরণের জন্ম দেয়, যার প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হন। এই রক্তাক্ত অধ্যায়কে কেবল একটি সাময়িক দুর্ঘটনা বা 'কমা' হিসেবে দেখার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগের একটি অংশ। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। নদীর পানি একবার সরে গেলে যেমন নতুন পানি আসে, তেমনি জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ বদলে গেলে পুরনো অবস্থানে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। অতি লোভে তাঁতি নষ্ট হওয়া কিংবা গাছের ডালে বসে গোড়া কাটার মতো ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত এখন দলটিকে দিতে হচ্ছে।

বর্তমান বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্য আমূল বদলে গেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন চাপের মুখোমুখি এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ। এই অবস্থায় শেখ হাসিনা যদি ডিসেম্বরে ফিরেও আসেন, তবে সেটি কোনো political বিজয় হবে না; romance-এর চেয়ে বেশি আইনি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা হবে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে আদালত, সাজা এবং রক্তাক্ত স্মৃতির মুখোমুখি হওয়াটা সহজ হবে না। নিহতদের পরিবারের কান্না, আহতদের ক্ষত এবং দেয়ালে লেখা স্লোগানের সামনে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে দাঁড়ানো অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত রাজনীতির সবচেয়ে বড় আদালত হলো জনগণের স্মৃতিশক্তি। তাই আওয়ামী লীগের জন্য এখন দিন গোনার চেয়ে নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডের গভীর আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবাই হবে একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin