ঢাকা ১১:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী মন্ত্রীকে না জানিয়ে সরকারি সফরে এপিএস, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি অসুস্থতার ভান করে মেকআপ মেখে ৫ চাকরি, প্রতারণায় অভিযুক্ত বাংলাদেশি ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন: সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চরফ্যাশনের বৃক্ষপ্রেমী ইমাম বাবুলের সাক্ষাৎ অক্টোবরের ১৩ দিনে ১৭ হাজার ২৮১ কোটি টাকার রেমিট্যান্স কুমিল্লায় জামায়াতের দুগ্রুপের সংঘর্ষ, সেক্রেটারি মাহবুবের গাড়ি ভাঙচুর বই পড়া ও হাজার বছরের সংস্কৃতি তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘর-আশপাশ পরিষ্কারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর শারদীয় দুর্গাপূজায় মণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশের ৫ দফা পরামর্শ

ডাকসু সংগ্রহশালা: ছবি সরিয়ে কি ইতিহাস মুছে ফেলা যায়?

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০১:২৩:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



দেয়াল থেকে একজনের ছবি নামিয়ে সেখানে আরেকজনের ছবি টাঙিয়ে দিলে কি একটি জাতির ইতিহাস নতুন করে লেখা যায়? ডাকসু সংগ্রহশালার সাম্প্রতিক ‘সংস্কার’ ঠিক এ প্রশ্নকেই আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে সংস্কার কাজ চলার পর গত রোববার যখন সংগ্রহশালাটি পুনরায় খোলা হলো, তখন দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ—আমাদের মুক্তিসংগ্রামের প্রায় প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্ব থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের আগের উপস্থিতি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেই সঙ্গে মুক্তিসংগ্রামের আরও বেশ কিছু স্মারকের অবস্থান পরিবর্তন এবং সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। বিপরীতে সেখানে যুক্ত করা হয়েছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি, যার একটি ১৯৪৮ সালের সেই কুখ্যাত ভাষণের মুহূর্তের, যেখানে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ভাষা আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, ঠিক সেখানেই ভাষা-প্রশ্নে বাংলা জনপদের প্রথম প্রতিপক্ষকে সম্মানের আসন দেওয়া নিছক কোনো অসতর্কতা হতে পারে না; এটি মূলত একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক বার্তা। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ঘটনাটিকে স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে, কিন্তু তাতে সৃষ্ট উদ্বেগ ও প্রশ্নগুলো মিলিয়ে যায় না।

প্রথম উদ্বেগটি ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে জড়িত। শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি—এই সত্যটি প্রশ্নাতীত ও অমোচনীয়। আমাদের ইতিহাসে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানীসহ আরও অনেকের অসামান্য অবদান রয়েছে; কিন্তু দ্বিধান্বিত ও বিভক্ত একটি জাতিকে চূড়ান্ত মুক্তির দিকে নেতৃত্ব দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন শেখ মুজিবই। তাঁর শাসনামল অবশ্যই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। একদলীয় বাকশাল শাসন, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, ভিন্নমত দমন কিংবা রক্ষীবাহিনীর নিপীড়নের জন্য তাঁকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। কিন্তু সমালোচনা করা আর ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ অপসারণ করা এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস ১৯৭১ সালে হঠাৎ করে শুরু হয়নি। সেই দীর্ঘ ইতিহাসে জিন্নাহর একটি ভূমিকা আছে। তবে মুজিব ও জিন্নাহ সময়, পরিপ্রেক্ষিত ও তাঁদের রাজনৈতিক ভূমিকার বিবেচনায় কোনোভাবেই পরস্পরের প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। মুজিবের জায়গায় জিন্নাহকে বসিয়ে কোনো ‘ভারসাম্য’ তৈরি হয় না, বরং এটি ইতিহাস নির্মাণের একটা স্থূল ও ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।

জিন্নাহ পাকিস্তানের ইতিহাসের একটি অনিবার্য চরিত্র এবং বাংলাদেশের অতীত বুঝতেও তিনি প্রাসঙ্গিক; কিন্তু এই ভূখণ্ডের মানুষের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে তিনি কোনো দিন দাঁড়াননি। তাঁকে কোনো সমালোচনামূলক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছাড়া কেবল ছবি হিসেবে দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া মানে তাঁর দমনমূলক ভূমিকাকে নীরবে বৈধতা দেওয়া। এটি নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চা নয়, বরং একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাছাই করা উল্টো-ভাষ্য। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে জামায়াতসহ কিছু ডানপন্থী শক্তি ইতিহাসের এমন এক নতুন বয়ান তৈরিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যা এই জাতির যাপিত অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিপরীত। ডাকসুর ঘটনাটি তারই একটি প্রকাশ। ইতিহাসচর্চার মূল কথাই হলো প্রত্যেককে তাঁর প্রাপ্য কৃতিত্ব ও প্রাপ্য সমালোচনা—দুটিই দেওয়া, ছবি অদলবদল করা নয়।

দ্বিতীয় বিষয়টি অত্যন্ত পরিহাসের। ক্ষমতার জোরে ইতিহাসের কোনো অংশ মুছে ফেলার জবরদস্তি প্রায়ই উল্টো ফল দেয়। সমাজ-মনোবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, চাপিয়ে দেওয়া বিস্মৃতি সবসময় পাল্টা-স্মৃতির জন্ম দেয়। ডাকসুতেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। মুজিবের ছবি নামিয়ে তাঁকে খর্ব করা যায়নি; বরং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে টেনে আনা হয়েছে। জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা এবং সেই জায়গায় গোলাম আযমের জুতাপেটার ছবি সেঁটে দেওয়ার মাধ্যমে সংগ্রহশালাটি একটি নীরব ঐতিহাসিক স্থান থেকে জীবন্ত রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস থেকে কাউকে জোর করে সরাতে গেলে তাঁর শহীদি মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে অবশ্য নতুন করে সেই মর্যাদা আরোপের প্রয়োজন নেই, তিনি তো ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে শহীদ হয়েছেনই। তাঁকে দেয়াল থেকে সরানোর চেষ্টা সেই ট্র্যাজেডির অনুরণনকেই আরও গাঢ় করে তোলে। আইকন ভাঙার চিরকালীন পরিহাস হলো, আইকন যত জোরে ভাঙা হয়, তার ছায়া তত দীর্ঘ হয়।

তৃতীয়ত, এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীরতর ব্যাধিকে উন্মোচিত করে। পঁচাত্তরের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবকে মোছার চেষ্টা হয়েছিল, আবার শেখ হাসিনার বিগত পনেরো বছরের শাসনামলে মুজিব বাদে বাকি সবাইকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখন চলছে আরেক দফা মোছামুছি। প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদল যেন পূর্বসূরিকে দেয়াল থেকে নামিয়ে দেওয়ার এক আদিম উৎসবে পরিণত হয়। নাম বদলে দেওয়া, প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলা কিংবা স্মারক গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ নয়। পরিণত গণতন্ত্র প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে না, বরং তার বৈধতা স্বীকার করে সহাবস্থান করে। আমাদের রাজনীতি এখনো প্রতিপক্ষকে শত্রুজ্ঞান করে মুছে ফেলতে চায়। অথচ একটি পরিণত জাতি তার সব ঐতিহাসিক চরিত্রকে তাদের কৃতিত্ব ও কলঙ্কসহ ইতিহাসের একই ঘরে জায়গা দেয়। কাউকে দেবতাতুল্য বানায় না, আবার কাউকে অস্তিত্বহীনও করে না।

সর্বশেষ বিষয়টি হলো প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার। ডাকসু সংগ্রহশালা কোনো নির্দিষ্ট দল বা পরিষদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত সম্পদ এবং জাতীয় ইতিহাসের আকর। এর প্রকৃত মালিকানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, ডাকসুর নয়। ডাকসুর কাজ প্রশাসনকে সহায়তা করা, সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তোলা নয়। কোনো একটি পক্ষ রাতারাতি নিজের মর্জিমাফিক এমন ঐতিহাসিক সংগ্রহ ঢেলে সাজাতে পারে না। আজ যদি এক পক্ষ এটি করে, তবে কাল আরেক পক্ষ এসে একই অধিকার দাবি করবে এবং একপর্যায়ে এই সংগ্রহশালাটি কেবল দলীয় প্রচারবোর্ডে পরিণত হবে। এর একমাত্র বিকল্প হলো পেশাদার কিউরেশন, প্রামাণ্য তালিকাভুক্তি, এবং সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা; রাজনৈতিক খেয়ালখুশি নয়। প্রকৃতপক্ষে, ডাকসু ভবন রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিকৃতির গ্যালারি হওয়ার কথা নয়; সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থী, বরেণ্য শিক্ষক, ক্যাম্পাস ও হলজীবনের চিত্রই বেশি মানানসই।

সুতরাং, ছবি নামিয়ে কিংবা টাঙিয়ে কখনো ইতিহাস পরিবর্তন করা যায় না। এমন চেষ্টা কেবল সংশ্লিষ্টদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক প্রজেক্ট এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীনতাকেই প্রকাশ করে, যা ভাঙচুরকে ইতিহাস রচনা ভেবে ভুল করে। সংগ্রহশালা চিরকাল টিকে থাকে, কিন্তু ক্ষমতার মেয়াদ একদিন ফুরিয়ে যায়। দেয়ালের ছবি আজ যিনি বদলাচ্ছেন, ইতিহাস একদিন তাঁকেও তাঁর যোগ্য স্থানে বসিয়ে দেবে।

এটাই ‘আইকন’ ভাঙার চিরকালীন পরিহাস: ‘আইকন’ যত জোরে ভাঙা হয়, তার ছায়া তত দীর্ঘ হয়।.হিন্দু ও মুসলমান কেন ’৪৭-কে ভিন্নভাবে স্মরণ করে.দেশভাগ ১৯৪৭: ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সীমান্ত আঁকার গল্প.তৃতীয় প্রসঙ্গটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরতর ব্যাধি নিয়ে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

ডাকসু সংগ্রহশালা: ছবি সরিয়ে কি ইতিহাস মুছে ফেলা যায়?

আপডেট সময় : ০১:২৩:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেয়াল থেকে একজনের ছবি নামিয়ে সেখানে আরেকজনের ছবি টাঙিয়ে দিলে কি একটি জাতির ইতিহাস নতুন করে লেখা যায়? ডাকসু সংগ্রহশালার সাম্প্রতিক ‘সংস্কার’ ঠিক এ প্রশ্নকেই আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে সংস্কার কাজ চলার পর গত রোববার যখন সংগ্রহশালাটি পুনরায় খোলা হলো, তখন দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ—আমাদের মুক্তিসংগ্রামের প্রায় প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্ব থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের আগের উপস্থিতি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেই সঙ্গে মুক্তিসংগ্রামের আরও বেশ কিছু স্মারকের অবস্থান পরিবর্তন এবং সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। বিপরীতে সেখানে যুক্ত করা হয়েছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি, যার একটি ১৯৪৮ সালের সেই কুখ্যাত ভাষণের মুহূর্তের, যেখানে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ভাষা আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, ঠিক সেখানেই ভাষা-প্রশ্নে বাংলা জনপদের প্রথম প্রতিপক্ষকে সম্মানের আসন দেওয়া নিছক কোনো অসতর্কতা হতে পারে না; এটি মূলত একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক বার্তা। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ঘটনাটিকে স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে, কিন্তু তাতে সৃষ্ট উদ্বেগ ও প্রশ্নগুলো মিলিয়ে যায় না।

প্রথম উদ্বেগটি ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে জড়িত। শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি—এই সত্যটি প্রশ্নাতীত ও অমোচনীয়। আমাদের ইতিহাসে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানীসহ আরও অনেকের অসামান্য অবদান রয়েছে; কিন্তু দ্বিধান্বিত ও বিভক্ত একটি জাতিকে চূড়ান্ত মুক্তির দিকে নেতৃত্ব দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন শেখ মুজিবই। তাঁর শাসনামল অবশ্যই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। একদলীয় বাকশাল শাসন, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, ভিন্নমত দমন কিংবা রক্ষীবাহিনীর নিপীড়নের জন্য তাঁকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। কিন্তু সমালোচনা করা আর ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ অপসারণ করা এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস ১৯৭১ সালে হঠাৎ করে শুরু হয়নি। সেই দীর্ঘ ইতিহাসে জিন্নাহর একটি ভূমিকা আছে। তবে মুজিব ও জিন্নাহ সময়, পরিপ্রেক্ষিত ও তাঁদের রাজনৈতিক ভূমিকার বিবেচনায় কোনোভাবেই পরস্পরের প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। মুজিবের জায়গায় জিন্নাহকে বসিয়ে কোনো ‘ভারসাম্য’ তৈরি হয় না, বরং এটি ইতিহাস নির্মাণের একটা স্থূল ও ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।

জিন্নাহ পাকিস্তানের ইতিহাসের একটি অনিবার্য চরিত্র এবং বাংলাদেশের অতীত বুঝতেও তিনি প্রাসঙ্গিক; কিন্তু এই ভূখণ্ডের মানুষের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে তিনি কোনো দিন দাঁড়াননি। তাঁকে কোনো সমালোচনামূলক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছাড়া কেবল ছবি হিসেবে দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া মানে তাঁর দমনমূলক ভূমিকাকে নীরবে বৈধতা দেওয়া। এটি নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চা নয়, বরং একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাছাই করা উল্টো-ভাষ্য। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে জামায়াতসহ কিছু ডানপন্থী শক্তি ইতিহাসের এমন এক নতুন বয়ান তৈরিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যা এই জাতির যাপিত অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিপরীত। ডাকসুর ঘটনাটি তারই একটি প্রকাশ। ইতিহাসচর্চার মূল কথাই হলো প্রত্যেককে তাঁর প্রাপ্য কৃতিত্ব ও প্রাপ্য সমালোচনা—দুটিই দেওয়া, ছবি অদলবদল করা নয়।

দ্বিতীয় বিষয়টি অত্যন্ত পরিহাসের। ক্ষমতার জোরে ইতিহাসের কোনো অংশ মুছে ফেলার জবরদস্তি প্রায়ই উল্টো ফল দেয়। সমাজ-মনোবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, চাপিয়ে দেওয়া বিস্মৃতি সবসময় পাল্টা-স্মৃতির জন্ম দেয়। ডাকসুতেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। মুজিবের ছবি নামিয়ে তাঁকে খর্ব করা যায়নি; বরং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে টেনে আনা হয়েছে। জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা এবং সেই জায়গায় গোলাম আযমের জুতাপেটার ছবি সেঁটে দেওয়ার মাধ্যমে সংগ্রহশালাটি একটি নীরব ঐতিহাসিক স্থান থেকে জীবন্ত রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস থেকে কাউকে জোর করে সরাতে গেলে তাঁর শহীদি মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে অবশ্য নতুন করে সেই মর্যাদা আরোপের প্রয়োজন নেই, তিনি তো ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে শহীদ হয়েছেনই। তাঁকে দেয়াল থেকে সরানোর চেষ্টা সেই ট্র্যাজেডির অনুরণনকেই আরও গাঢ় করে তোলে। আইকন ভাঙার চিরকালীন পরিহাস হলো, আইকন যত জোরে ভাঙা হয়, তার ছায়া তত দীর্ঘ হয়।

তৃতীয়ত, এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীরতর ব্যাধিকে উন্মোচিত করে। পঁচাত্তরের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবকে মোছার চেষ্টা হয়েছিল, আবার শেখ হাসিনার বিগত পনেরো বছরের শাসনামলে মুজিব বাদে বাকি সবাইকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখন চলছে আরেক দফা মোছামুছি। প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদল যেন পূর্বসূরিকে দেয়াল থেকে নামিয়ে দেওয়ার এক আদিম উৎসবে পরিণত হয়। নাম বদলে দেওয়া, প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলা কিংবা স্মারক গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ নয়। পরিণত গণতন্ত্র প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে না, বরং তার বৈধতা স্বীকার করে সহাবস্থান করে। আমাদের রাজনীতি এখনো প্রতিপক্ষকে শত্রুজ্ঞান করে মুছে ফেলতে চায়। অথচ একটি পরিণত জাতি তার সব ঐতিহাসিক চরিত্রকে তাদের কৃতিত্ব ও কলঙ্কসহ ইতিহাসের একই ঘরে জায়গা দেয়। কাউকে দেবতাতুল্য বানায় না, আবার কাউকে অস্তিত্বহীনও করে না।

সর্বশেষ বিষয়টি হলো প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার। ডাকসু সংগ্রহশালা কোনো নির্দিষ্ট দল বা পরিষদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত সম্পদ এবং জাতীয় ইতিহাসের আকর। এর প্রকৃত মালিকানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, ডাকসুর নয়। ডাকসুর কাজ প্রশাসনকে সহায়তা করা, সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তোলা নয়। কোনো একটি পক্ষ রাতারাতি নিজের মর্জিমাফিক এমন ঐতিহাসিক সংগ্রহ ঢেলে সাজাতে পারে না। আজ যদি এক পক্ষ এটি করে, তবে কাল আরেক পক্ষ এসে একই অধিকার দাবি করবে এবং একপর্যায়ে এই সংগ্রহশালাটি কেবল দলীয় প্রচারবোর্ডে পরিণত হবে। এর একমাত্র বিকল্প হলো পেশাদার কিউরেশন, প্রামাণ্য তালিকাভুক্তি, এবং সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা; রাজনৈতিক খেয়ালখুশি নয়। প্রকৃতপক্ষে, ডাকসু ভবন রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিকৃতির গ্যালারি হওয়ার কথা নয়; সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থী, বরেণ্য শিক্ষক, ক্যাম্পাস ও হলজীবনের চিত্রই বেশি মানানসই।

সুতরাং, ছবি নামিয়ে কিংবা টাঙিয়ে কখনো ইতিহাস পরিবর্তন করা যায় না। এমন চেষ্টা কেবল সংশ্লিষ্টদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক প্রজেক্ট এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীনতাকেই প্রকাশ করে, যা ভাঙচুরকে ইতিহাস রচনা ভেবে ভুল করে। সংগ্রহশালা চিরকাল টিকে থাকে, কিন্তু ক্ষমতার মেয়াদ একদিন ফুরিয়ে যায়। দেয়ালের ছবি আজ যিনি বদলাচ্ছেন, ইতিহাস একদিন তাঁকেও তাঁর যোগ্য স্থানে বসিয়ে দেবে।

এটাই ‘আইকন’ ভাঙার চিরকালীন পরিহাস: ‘আইকন’ যত জোরে ভাঙা হয়, তার ছায়া তত দীর্ঘ হয়।.হিন্দু ও মুসলমান কেন ’৪৭-কে ভিন্নভাবে স্মরণ করে.দেশভাগ ১৯৪৭: ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সীমান্ত আঁকার গল্প.তৃতীয় প্রসঙ্গটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরতর ব্যাধি নিয়ে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo