ঢাকা ০৬:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মক্কা-জেদ্দাসহ সৌদির বিভিন্ন এলাকায় সিভিল ডিফেন্সের সতর্কতা জারি আ.লীগ ফিরলে জামায়াত নেতাদের আবারও ফাঁসি দেবে: রাশেদ খাঁন মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা ইসলামের চিরন্তন শিক্ষা এমপি গাজী নজরুল আবারও রিমান্ডে, এবার ৪ দিনের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করে নিপীড়িত হয়েছেন রুহুল আমিন গাজী: রিজভী তুরস্কের শানলিউরফায় ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত ইসলামাবাদে পিটিআইয়ের মিছিল ঘিরে দেশজুড়ে ধরপাকড় ও কড়াকড়ি ৫১তম বিসিএসে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, আবেদন শুরু ১ অক্টোবর জানুয়ারি থেকে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশনের আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা: নিহত ৪, পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

সৌদিতে হুতিদের আক্রমণ ও মক্কা চুক্তির প্রথম অগ্নিপরীক্ষা

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১১:১৩:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইয়েমেন ও এর আশপাশের অঞ্চলে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বিস্তারে বড় ধরনের অভিযানে নেমেছে হুতিরা। গত মঙ্গলবার ইরানপন্থী এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি সৌদি আরবে একযোগে একঝাঁক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এরপর বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের কৌশলগত লোহিত সাগর উপকূলে তীব্র লড়াইয়ের পর সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরটি দখল করে নেয় তারা। এর পরের দিন শুক্রবার হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালির মুখে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত সপ্তাহ পর্যন্ত এই মোখা বন্দরটি ছিল হুতিবিরোধী জোটের একটি শক্ত ঘাঁটি এবং তাদের আগ্রাসন ঠেকানোর প্রধান প্রতিরক্ষা প্রাচীর। কিন্তু সাম্প্রতিক এই অভিযানের মাধ্যমে হুতিরা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত করার পথ তৈরি করেছে, যার মূল সুবিধাভোগী মূলত ইরান।

মোখা বন্দরটি বাব আল-মানদেব থেকে ৫০ মাইলেরও কম দূরে অবস্থিত। ফলে এই বন্দর এবং পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় হুতিরা এখন এই কৌশলগত প্রণালির নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারছে, যা তাদের জন্য আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির পথ আরও সহজ করে দেবে। জুলাই মাসে সৌদি স্বার্থে আঘাত হানার মাধ্যমে হুতিরা যে নতুন তৎপরতা শুরু করেছিল, তার প্রভাব বেশ সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে সৌদি তেল পরিবহনের জন্য লোহিত সাগর যখন বিকল্প পথ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই হুতিরা এই পদক্ষেপ নেয়। হুতি নেতারা তাঁদের এই অভিযানকে স্থানীয় লড়াই হিসেবে তুলে ধরলেও তেহরানের সঙ্গে তাঁদের সামরিক ও কৌশলগত অক্ষ যে আরও শক্ত হয়েছে, তা স্পষ্ট। সৌদি আরব ও দেশটির তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে হুতিরা কার্যত ইরান যুদ্ধের এক নতুন রণক্ষেত্র বা ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’ খুলে দিয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম প্রায় পাঁচ মাস হুতিরা একপ্রকার নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সেই আপেক্ষিক শান্তি ভেঙে যায়। তেহরান থেকে হুতিদের একটি প্রতিনিধিদলকে বিমানে করে সানায় উড়িয়ে নিয়ে আসে ইরান, যা ছিল ইয়েমেনের আকাশসীমার ওপর সৌদি জোট ও ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার শামিল। বিমানটিকে অবতরণে বাধা দিতে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার সানা বিমানবন্দরের একমাত্র রানওয়েতে বোমা হামলা চালায়। বিমানটি শেষ পর্যন্ত হুতি নিয়ন্ত্রিত হোদেইদাহ বন্দরে অবতরণ করলেও, সৌদি বাহিনীর ওই হামলা হুতিদের অস্ত্রবিরতি চুক্তি ভেঙে ফেলার একটি নিখুঁত বাহানা এনে দেয়। ঠিক এরপরই গোষ্ঠীটি সৌদি স্বার্থে নতুন করে হামলা শুরু করে এবং ইয়েমেনে মোতায়েন থাকা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে জোরদার সামরিক অভিযান চালায়। হুতিদের এই পুরো কৌশলের মূলে রয়েছে সৌদি আরবের বর্তমান দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া। ইরান হরমুজ প্রণালি প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলায় লোহিত সাগরই হয়ে উঠেছিল সৌদি তেলশিল্পের প্রধান ভরসা। যুদ্ধের অধিকাংশ সময় সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দরগুলো দিয়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ সচল রেখেছিল। কিন্তু জুলাইয়ে হুতিরা নতুন করে আক্রমণ শুরু করার পর বাব আল-মানদেব দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানি প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে।

অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ হুতিদের চরমপন্থী লক্ষ্যগুলোকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ২০২২ সালের অস্ত্রবিরতির পর তৈরি হওয়া ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ এমন ঝুলন্ত পরিস্থিতিতে গোষ্ঠীটি হতাশ হয়ে পড়েছিল এবং ১২ বছরের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক political সমাধান ঝুলিয়ে রাখার জন্য তারা রিয়াদকে দায়ী করে আসছিল। ২০২৩ সালে জাতিসংঘ একটি সমঝোতার খসড়া তৈরি করে, যার মাধ্যমে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক আলোচনা শুরুর বিনিময়ে হুতিরা সব সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন মেটানো এবং দেশের তেল-গ্যাসের রাজস্বের একটি অংশ পাওয়ার সুযোগ পেত। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন এবং দেশে কোনো তেল-গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ না থাকা হুতিদের জন্য এটি ছিল একটি সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে তারা গাজায় হামাসের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা চালানো শুরু করে।

গাজা যুদ্ধের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইয়েমেনে হুতিদের ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক সামরিক ও অর্থনৈতিক আঘাত হানে। এর কয়েক মাস পর ইসরায়েলি বাহিনী হুতিদের মূল অবকাঠামো ধ্বংস করে এবং তাদের ডি ফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক প্রধানকে হত্যা করে। কিন্তু এসব অভিযান হুতিদের দমানোর বদলে আরও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে আঘাত হেনে হুতিরা ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘অক্ষশক্তি’তে নিজেদের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করেছে। সম্প্রতি ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হুতিরা বর্তমানে নিজেদের দেশে সামরিক সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। ফলে ইরান থেকে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ না পেলেও তারা নিজেদের অস্ত্রাগারকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পেরেছে।

লোহিত সাগরের ওপর সৌদি আরবের চরম নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে হুতিরা হয়তো ভেবেছিল রিয়াদ দ্রুত তাদের সব দাবি মেনে নেবে। কিন্তু নতজানু হওয়ার বদলে হুতিদের এই আগ্রাসন রিয়াদকে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। ওয়াশিংটনের অস্থিতিশীল নীতির কথা মাথায় রেখে সৌদি আরব বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোটের দিকে জোর দিয়েছে। গত ৩০ জুলাই রিয়াদ তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, সুদান, জিবুতিসহ ১৪টি দেশকে নিয়ে লোহিত সাগরে একটি যৌথ নৌ জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। এর এক সপ্তাহ পর মক্কায় এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ক্রাউন প্রিন্স একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তবে এই সামরিক জোটগুলোর কার্যকারিতা কতটুকু, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে এবং হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা ছিল এই চুক্তির প্রথম পরীক্ষা। এ পর্যন্ত এর ফলাফল বেশ হতাশাজনক। তুরস্ক বা পাকিস্তান কেউই ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়নি এবং ইসলামাবাদ নিশ্চিত করেছে যে মক্কা চুক্তিটি এই যুদ্ধের জন্য প্রযোজ্য নয়।

পাশাপাশি সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্রমাগত সামরিক সহায়তা চেয়ে আসছে। গত ২৮ জুলাই হুতিদের অনুগত ইরাকি মিলিশিয়াদের ওপর সৌদি ও মার্কিন বাহিনী যৌথভাবে হামলা চালায়, যা ইঙ্গিত দেয় যে সংঘাত বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সৌদিদের পাশে এসে দাঁড়াবে। তবে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। হুতিদের মোখা ও পেরিম দ্বীপ দখল ওয়াশিংটনকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করলেও ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন কোনো সামরিক জটিলতায় জড়াতে রাজি নয়। বৃহস্পতিবারের হুতি আগ্রাসনের পর সৌদি আরবের বিমান হামলার অনুরোধ ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন। হুতিরা যদি মোখা ও তার আশপাশের এলাকাগুলোতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে ফেলে, তবে তা সরকারি বাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দেবে এবং নিজেদের ভেতরের ফাটল আরও চওড়া করবে।

যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু হুতিদের ব্যবহার করে ইরান এখন রিয়াদের বিকল্প পথটিও বন্ধ করার শক্ত সুযোগ পেয়ে গেছে। তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো—একদিকে বাব আল–মানদেবে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই কৌশল সফল হলে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যের ট্রিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। যদিও তেহরান সরাসরি হুতিদের দৈনন্দিন সামরিক আদেশ দেয় না, তবে তাদের ওপর ইরানের প্রভাব অপরিসীম। সৌদি আরবে হামলায় ইরাকি মিলিশিয়াদের যুক্ত করার হুতিদের সিদ্ধান্ত ইয়েমেন সংকটকে সরাসরি ইরান যুদ্ধের সঙ্গে পেঁচিয়ে ফেলেছে। এ ছাড়া সোমালিয়া ও সুদানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে হুতিদের সাম্প্রতিক যোগাযোগ ইঙ্গিত দেয় যে এই সংঘাত খুব দ্রুত পুরো হর্ন অব আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্তমান ইরান যুদ্ধ, হুতিদের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং জ্বালানি বাণিজ্যে তাদের যৌথ বাধা দেওয়ার ক্ষমতার কারণে পরিস্থিতি এখন আরও ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে রূপ নিচ্ছে। আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই পার হয়ে ইয়েমেন এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সংঘাতের একটি মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

ইরানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে ইয়েমেনের ওপর অবরোধ তুলতে হবে। যার সহজ অর্থ হলো, রাজধানী সানাসহ হুতি–নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর থেকে সৌদি আরবের যাবতীয় যাতায়াত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইয়েমেন সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করা। অঞ্চলের এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিতে চাইছে ইরান ও তার মিত্ররা। হুতিদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় হাতে থাকা বিকল্পগুলো দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হুতিদের পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়। হুতিদের এই সামরিক সাফল্য একটি diplomatic ও শান্তিপূর্ণ সমঝোতার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। রণক্ষেত্রে জয়ের পর এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি তাদের মূল দাবি ও লোহিত সাগরে আধিপত্য বিস্তারের নীতিতে এখন আরও বেশি অনড় অবস্থান নেবে, সেটাই স্বাভাবিক। সহজ কোনো সমাধান এই মুহূর্তে কারও হাতে নেই।

সংঘাতের এই মারাত্মক চক্র শুরু হওয়ার পর এখন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। সৌদি আরব হয়তো হুতিদের এই সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের নতুন মিত্রদের নিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবে। কিন্তু স্থলভাগের দুর্বলতা দূর না করে শুধু বিমান হামলা চালালে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে, যা মূলত হুতি ও ইরানের কৌশলকেই জয়ী করবে। দীর্ঘস্থায়ী ইয়েমেন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানের সঙ্গে সামরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর পথকেও জটিল করে তুলবে। তবে অনিয়ন্ত্রিত সংঘাত থামিয়ে আলোচনার টেবিলে ফেরার একটি ক্ষীণ সুযোগ এখনো রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারকে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধানের খসড়া তৈরি করতে হবে।

এমন একটি রাজনৈতিক চুক্তিতে হুতিদের আনতে হলে সৌদি ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সামরিকভাবে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, যাতে হুতিরা বুঝতে পারে যে অস্ত্রের মুখে তারা সব দাবি আদায় করতে পারবে না। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষের কারণে হুতিদের ওপরও চাপ রয়েছে, তাই তাদের যদি বোঝানো যায় যে সামরিকভাবে জয় অসম্ভব, তবে তারা আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হতে পারে। একটি নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করা হয়তো সহজ হবে না এবং রাতারাতি তা সম্ভবও নয়। কিন্তু এর বিকল্প আরও ভয়াবহ—একটি অনিয়ন্ত্রিত, দীর্ঘস্থায়ী ও আঞ্চলিক যুদ্ধ, যা শুরু করা সহজ হলেও শেষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

সৌদিতে হুতিদের আক্রমণ ও মক্কা চুক্তির প্রথম অগ্নিপরীক্ষা

আপডেট সময় : ১১:১৩:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইয়েমেন ও এর আশপাশের অঞ্চলে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বিস্তারে বড় ধরনের অভিযানে নেমেছে হুতিরা। গত মঙ্গলবার ইরানপন্থী এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি সৌদি আরবে একযোগে একঝাঁক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এরপর বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের কৌশলগত লোহিত সাগর উপকূলে তীব্র লড়াইয়ের পর সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরটি দখল করে নেয় তারা। এর পরের দিন শুক্রবার হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালির মুখে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত সপ্তাহ পর্যন্ত এই মোখা বন্দরটি ছিল হুতিবিরোধী জোটের একটি শক্ত ঘাঁটি এবং তাদের আগ্রাসন ঠেকানোর প্রধান প্রতিরক্ষা প্রাচীর। কিন্তু সাম্প্রতিক এই অভিযানের মাধ্যমে হুতিরা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত করার পথ তৈরি করেছে, যার মূল সুবিধাভোগী মূলত ইরান।

মোখা বন্দরটি বাব আল-মানদেব থেকে ৫০ মাইলেরও কম দূরে অবস্থিত। ফলে এই বন্দর এবং পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় হুতিরা এখন এই কৌশলগত প্রণালির নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারছে, যা তাদের জন্য আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির পথ আরও সহজ করে দেবে। জুলাই মাসে সৌদি স্বার্থে আঘাত হানার মাধ্যমে হুতিরা যে নতুন তৎপরতা শুরু করেছিল, তার প্রভাব বেশ সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে সৌদি তেল পরিবহনের জন্য লোহিত সাগর যখন বিকল্প পথ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই হুতিরা এই পদক্ষেপ নেয়। হুতি নেতারা তাঁদের এই অভিযানকে স্থানীয় লড়াই হিসেবে তুলে ধরলেও তেহরানের সঙ্গে তাঁদের সামরিক ও কৌশলগত অক্ষ যে আরও শক্ত হয়েছে, তা স্পষ্ট। সৌদি আরব ও দেশটির তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে হুতিরা কার্যত ইরান যুদ্ধের এক নতুন রণক্ষেত্র বা ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’ খুলে দিয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম প্রায় পাঁচ মাস হুতিরা একপ্রকার নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সেই আপেক্ষিক শান্তি ভেঙে যায়। তেহরান থেকে হুতিদের একটি প্রতিনিধিদলকে বিমানে করে সানায় উড়িয়ে নিয়ে আসে ইরান, যা ছিল ইয়েমেনের আকাশসীমার ওপর সৌদি জোট ও ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার শামিল। বিমানটিকে অবতরণে বাধা দিতে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার সানা বিমানবন্দরের একমাত্র রানওয়েতে বোমা হামলা চালায়। বিমানটি শেষ পর্যন্ত হুতি নিয়ন্ত্রিত হোদেইদাহ বন্দরে অবতরণ করলেও, সৌদি বাহিনীর ওই হামলা হুতিদের অস্ত্রবিরতি চুক্তি ভেঙে ফেলার একটি নিখুঁত বাহানা এনে দেয়। ঠিক এরপরই গোষ্ঠীটি সৌদি স্বার্থে নতুন করে হামলা শুরু করে এবং ইয়েমেনে মোতায়েন থাকা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে জোরদার সামরিক অভিযান চালায়। হুতিদের এই পুরো কৌশলের মূলে রয়েছে সৌদি আরবের বর্তমান দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া। ইরান হরমুজ প্রণালি প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলায় লোহিত সাগরই হয়ে উঠেছিল সৌদি তেলশিল্পের প্রধান ভরসা। যুদ্ধের অধিকাংশ সময় সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দরগুলো দিয়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ সচল রেখেছিল। কিন্তু জুলাইয়ে হুতিরা নতুন করে আক্রমণ শুরু করার পর বাব আল-মানদেব দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানি প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে।

অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ হুতিদের চরমপন্থী লক্ষ্যগুলোকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ২০২২ সালের অস্ত্রবিরতির পর তৈরি হওয়া ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ এমন ঝুলন্ত পরিস্থিতিতে গোষ্ঠীটি হতাশ হয়ে পড়েছিল এবং ১২ বছরের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক political সমাধান ঝুলিয়ে রাখার জন্য তারা রিয়াদকে দায়ী করে আসছিল। ২০২৩ সালে জাতিসংঘ একটি সমঝোতার খসড়া তৈরি করে, যার মাধ্যমে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক আলোচনা শুরুর বিনিময়ে হুতিরা সব সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন মেটানো এবং দেশের তেল-গ্যাসের রাজস্বের একটি অংশ পাওয়ার সুযোগ পেত। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন এবং দেশে কোনো তেল-গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ না থাকা হুতিদের জন্য এটি ছিল একটি সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে তারা গাজায় হামাসের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা চালানো শুরু করে।

গাজা যুদ্ধের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইয়েমেনে হুতিদের ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক সামরিক ও অর্থনৈতিক আঘাত হানে। এর কয়েক মাস পর ইসরায়েলি বাহিনী হুতিদের মূল অবকাঠামো ধ্বংস করে এবং তাদের ডি ফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক প্রধানকে হত্যা করে। কিন্তু এসব অভিযান হুতিদের দমানোর বদলে আরও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে আঘাত হেনে হুতিরা ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘অক্ষশক্তি’তে নিজেদের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করেছে। সম্প্রতি ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হুতিরা বর্তমানে নিজেদের দেশে সামরিক সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। ফলে ইরান থেকে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ না পেলেও তারা নিজেদের অস্ত্রাগারকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পেরেছে।

লোহিত সাগরের ওপর সৌদি আরবের চরম নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে হুতিরা হয়তো ভেবেছিল রিয়াদ দ্রুত তাদের সব দাবি মেনে নেবে। কিন্তু নতজানু হওয়ার বদলে হুতিদের এই আগ্রাসন রিয়াদকে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। ওয়াশিংটনের অস্থিতিশীল নীতির কথা মাথায় রেখে সৌদি আরব বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোটের দিকে জোর দিয়েছে। গত ৩০ জুলাই রিয়াদ তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, সুদান, জিবুতিসহ ১৪টি দেশকে নিয়ে লোহিত সাগরে একটি যৌথ নৌ জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। এর এক সপ্তাহ পর মক্কায় এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ক্রাউন প্রিন্স একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তবে এই সামরিক জোটগুলোর কার্যকারিতা কতটুকু, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে এবং হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা ছিল এই চুক্তির প্রথম পরীক্ষা। এ পর্যন্ত এর ফলাফল বেশ হতাশাজনক। তুরস্ক বা পাকিস্তান কেউই ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়নি এবং ইসলামাবাদ নিশ্চিত করেছে যে মক্কা চুক্তিটি এই যুদ্ধের জন্য প্রযোজ্য নয়।

পাশাপাশি সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্রমাগত সামরিক সহায়তা চেয়ে আসছে। গত ২৮ জুলাই হুতিদের অনুগত ইরাকি মিলিশিয়াদের ওপর সৌদি ও মার্কিন বাহিনী যৌথভাবে হামলা চালায়, যা ইঙ্গিত দেয় যে সংঘাত বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সৌদিদের পাশে এসে দাঁড়াবে। তবে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। হুতিদের মোখা ও পেরিম দ্বীপ দখল ওয়াশিংটনকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করলেও ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন কোনো সামরিক জটিলতায় জড়াতে রাজি নয়। বৃহস্পতিবারের হুতি আগ্রাসনের পর সৌদি আরবের বিমান হামলার অনুরোধ ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন। হুতিরা যদি মোখা ও তার আশপাশের এলাকাগুলোতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে ফেলে, তবে তা সরকারি বাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দেবে এবং নিজেদের ভেতরের ফাটল আরও চওড়া করবে।

যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু হুতিদের ব্যবহার করে ইরান এখন রিয়াদের বিকল্প পথটিও বন্ধ করার শক্ত সুযোগ পেয়ে গেছে। তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো—একদিকে বাব আল–মানদেবে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই কৌশল সফল হলে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যের ট্রিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। যদিও তেহরান সরাসরি হুতিদের দৈনন্দিন সামরিক আদেশ দেয় না, তবে তাদের ওপর ইরানের প্রভাব অপরিসীম। সৌদি আরবে হামলায় ইরাকি মিলিশিয়াদের যুক্ত করার হুতিদের সিদ্ধান্ত ইয়েমেন সংকটকে সরাসরি ইরান যুদ্ধের সঙ্গে পেঁচিয়ে ফেলেছে। এ ছাড়া সোমালিয়া ও সুদানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে হুতিদের সাম্প্রতিক যোগাযোগ ইঙ্গিত দেয় যে এই সংঘাত খুব দ্রুত পুরো হর্ন অব আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্তমান ইরান যুদ্ধ, হুতিদের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং জ্বালানি বাণিজ্যে তাদের যৌথ বাধা দেওয়ার ক্ষমতার কারণে পরিস্থিতি এখন আরও ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে রূপ নিচ্ছে। আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই পার হয়ে ইয়েমেন এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সংঘাতের একটি মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

ইরানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে ইয়েমেনের ওপর অবরোধ তুলতে হবে। যার সহজ অর্থ হলো, রাজধানী সানাসহ হুতি–নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর থেকে সৌদি আরবের যাবতীয় যাতায়াত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইয়েমেন সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করা। অঞ্চলের এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিতে চাইছে ইরান ও তার মিত্ররা। হুতিদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় হাতে থাকা বিকল্পগুলো দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হুতিদের পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়। হুতিদের এই সামরিক সাফল্য একটি diplomatic ও শান্তিপূর্ণ সমঝোতার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। রণক্ষেত্রে জয়ের পর এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি তাদের মূল দাবি ও লোহিত সাগরে আধিপত্য বিস্তারের নীতিতে এখন আরও বেশি অনড় অবস্থান নেবে, সেটাই স্বাভাবিক। সহজ কোনো সমাধান এই মুহূর্তে কারও হাতে নেই।

সংঘাতের এই মারাত্মক চক্র শুরু হওয়ার পর এখন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। সৌদি আরব হয়তো হুতিদের এই সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের নতুন মিত্রদের নিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবে। কিন্তু স্থলভাগের দুর্বলতা দূর না করে শুধু বিমান হামলা চালালে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে, যা মূলত হুতি ও ইরানের কৌশলকেই জয়ী করবে। দীর্ঘস্থায়ী ইয়েমেন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানের সঙ্গে সামরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর পথকেও জটিল করে তুলবে। তবে অনিয়ন্ত্রিত সংঘাত থামিয়ে আলোচনার টেবিলে ফেরার একটি ক্ষীণ সুযোগ এখনো রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারকে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধানের খসড়া তৈরি করতে হবে।

এমন একটি রাজনৈতিক চুক্তিতে হুতিদের আনতে হলে সৌদি ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সামরিকভাবে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, যাতে হুতিরা বুঝতে পারে যে অস্ত্রের মুখে তারা সব দাবি আদায় করতে পারবে না। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষের কারণে হুতিদের ওপরও চাপ রয়েছে, তাই তাদের যদি বোঝানো যায় যে সামরিকভাবে জয় অসম্ভব, তবে তারা আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হতে পারে। একটি নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করা হয়তো সহজ হবে না এবং রাতারাতি তা সম্ভবও নয়। কিন্তু এর বিকল্প আরও ভয়াবহ—একটি অনিয়ন্ত্রিত, দীর্ঘস্থায়ী ও আঞ্চলিক যুদ্ধ, যা শুরু করা সহজ হলেও শেষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo