ক্যালিফোর্নিয়ায় আয়শা ওয়াহাবের জয় ও মার্কিন রাজনীতির ভিন্ন রূপ
- আপডেট সময় : ১২:৫৫:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি, আধিপত্য বিস্তার বা নেতিবাচক খবরগুলোর বাইরেও দেশটিতে রয়েছে মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বপ্ন পূরণের এক অন্য রকম বাস্তবতা। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষ নির্বাচনে আফগান শরণার্থী পরিবারের সন্তান ড. আয়শা ওয়াহাবের কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হওয়া মার্কিন রাজনীতির সেই ইতিবাচক ও প্রগতিশীল পরিবর্তনেরই এক বড় উদাহরণ। ইসরায়েলপন্থী লবি আইপাকের (AIPAC) বিপুল অর্থ খরচ ও বিরোধিতাকে পাশ কাটিয়ে তাঁর এই জয় যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে প্রগতিশীলদের শক্তিশালী অবস্থানের বার্তা দিচ্ছে।
আয়শা ওয়াহাবের জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্পটি যেকোনো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। ১৯৮৭ সালে নিউইয়র্কে এক আফগান শরণার্থী দম্পতির ঘরে তাঁর জন্ম হয়। খুব ছোটকালেই তিনি তাঁর বাবাকে আততায়ীর গুলিতে হারান এবং এর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। এরপর আয়শা ও তাঁর বোনকে ফস্টার কেয়ারে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আফগান পরিবার তাঁদের দত্তক নেয়। প্রতিকূলতা পেরিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সমাজকর্মে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন আয়শা। নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার আগে তিনি প্রযুক্তি খাত, অলাভজনক সংস্থা ও সামাজিক জনস্বার্থমূলক প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন।
আয়শার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকার হেওয়ার্ডে স্থানীয় রাজনীতি ও সাশ্রয়ী আবাসন আন্দোলনের মাধ্যমে। ২০১৮ সালে তিনি হেওয়ার্ড সিটি কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট সিনেটে জয়ী হওয়ার আগপর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার এক ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য পদত্যাগ করলে শূন্য হওয়া ক্যালিফোর্নিয়া ১৪ কংগ্রেস এলাকায় বিশেষ নির্বাচনে অংশ নেন আয়শা। এই নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টিরই আরেক সদস্য হার্নান্দেজ, যাঁকে জেতাতে ইসরায়েলি লবি আইপাক চার মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। কিন্তু গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করা প্রগতিশীল প্রার্থী আয়শা ওয়াহাবকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেন সান ফ্রান্সিসকোর ভোটাররা।
বিশ্লেষকদের মতে, আয়শার এই জয় ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরে প্রগতিশীল অংশ এবং ইসরায়েল সমর্থকদের মধ্যকার দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে এবং দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ করা উচিত। এই জনমতের ওপর ভর করে প্রগতিশীল ও বিশেষ করে মুসলমান রাজনীতিবিদেরা এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভালো করার আশা করছেন। ইতোমধ্যে ইলহাম ওমর, রাশিদা তালিব, লতিফ সাইমন, গাজালা হাশমিদের মতো প্রার্থীরা মার্কিন রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে শুধু আফগান বংশোদ্ভূতরাই নন, অন্যান্য দেশের অভিবাসী ও তাঁদের সন্তানরাও দারুণভাবে অবদান রাখছেন। ২০১১ সালে মিশিগান থেকে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন হ্যানসেন ক্লার্ক। এছাড়া নুসরাত জাহান চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সিনেটর হিসেবে শেখ রহমান (জর্জিয়া), নাবিলা ইসলাম (জর্জিয়া), সাদ্দাম সালিম (ভার্জিনিয়া) এবং আবুল খান (নিউ হ্যামশায়ার) নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে উগান্ডা থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান জোহরান মামদানি বর্তমানে নিউইয়র্ক শহরের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মিশিগানের প্রাইমারি নির্বাচনে জয়ী হয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর প্রার্থী হয়েছেন মিসরীয় দম্পতির সন্তান আবদুল আল-সাইয়েদ, যিনি জনমত জরিপে তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ৭ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন। নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হলে তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলমান সিনেটর।
যুক্তরাষ্ট্র শুধু আধিপত্য বা খামখেয়ালি নীতির দেশ নয়, এটি মানুষের স্বপ্ন গড়ারও দেশ। তামিলনাড়ুর মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সুন্দর পিচাই, যাঁর ঘরে একমাত্র ইলেকট্রনিক যন্ত্র ছিল একটি পুরোনো সাদাকালো টেলিভিশন, আজ তিনি গুগলের সিইও এবং তাঁর তিন বছরের পারিশ্রমিক প্যাকেজ ৬৯২ মিলিয়ন ডলার। একইভাবে বহু বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে এসে ট্যাক্সি চালিয়ে বা ছোটখাটো কাজ করে ছেলেমেয়েদের ভালো কলেজে পড়াচ্ছেন। এমনকি প্রথম সাত বছর ম্যাকডোনাল্ডে কাজ করা এক বাংলাদেশি এখন নিজেই ১২টি ম্যাকডোনাল্ডের মালিক। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, পার্কচেস্টার বা ব্রুকলিনে বাংলাদেশিরা নিজেদের পরিশ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছেন ছোট ছোট বাংলাদেশ। রিপাবলিকান দল বা ইসরায়েলি লবির অনবরত বিষোদ্গারের মধ্যেও মার্কিন ভোটাররা যেভাবে বিভিন্ন ধর্মের ও বর্ণের প্রার্থীদের নির্বাচিত করছেন, তা যেন এক ভিন্ন ও ইতিবাচক যুক্তরাষ্ট্রেরই প্রতিচ্ছবি।





























