মক্কা চুক্তিতে মিসরকে কেন পাশে চায় তুরস্ক
- আপডেট সময় : ০২:৩১:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ভূরাজনীতি ও জ্বালানি সমীকরণে মিসর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অবস্থানে রয়েছে। এই অঞ্চলে আবিষ্কৃত বিপুল গ্যাস সম্পদকে বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মিসরের অবকাঠামোই সবচেয়ে বড় ভরসা। আর এ কারণেই আঙ্কারা তাদের প্রস্তাবিত 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি' বা জোটে কায়রোকে শামিল করতে বিশেষভাবে আগ্রহী।
ভূমধ্যসাগরে মিসরের 'জোহর', ইসরায়েলের 'তামার' ও 'লেভিয়াথান' এবং সাইপ্রাসের 'আফ্রোদিতে', 'গ্লকাস' ও 'ক্রোনোস' গ্যাসক্ষেত্রগুলো বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে এই গ্যাসের প্রকৃত কৌশলগত মূল্য তৈরি হয় তখনই, যখন তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। আর এখানেই মিসরের গুরুত্ব অনস্বীকার্য, কারণ এই অঞ্চলের একমাত্র বৃহৎ গ্যাস তরলীকরণ বা 'লিকুইফ্যাকশন ফ্যাসিলিটি' দুটি মিসরের ইদকু ও দামিয়েত্তাতেই অবস্থিত। ইসরায়েল ইতিমধ্যেই পাইপলাইনের মাধ্যমে মিসরে গ্যাস পাঠাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৮ সাল থেকে সাইপ্রাসের ক্রোনোস ক্ষেত্রের গ্যাসও মিসরের অবকাঠামো ব্যবহার করে রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউরোপকে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে কেবল নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুরক্ষিত পাইপলাইন ও টেকসই চুক্তি। তবে এই সম্ভাবনার বড় বাধা ভূরাজনীতি। সমুদ্রসীমা বিরোধ ও সাইপ্রাস বিভক্তি নিয়ে জটিলতা রয়েই গেছে। তুরস্কের ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ নীতি গ্রিস ও সাইপ্রাসের পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করছে। অন্যদিকে তুর্কি সাইপ্রাসবাসীর দাবিকে উপেক্ষা করে নেওয়া যেকোনো লাইসেন্সিং সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করছে আঙ্কারা। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এবং ২০২০ সালে আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘ইস্ট মেডিটেরেনিয়ান গ্যাস ফোরাম’ (ইএমজিএফ)-এ মিসর, সাইপ্রাস, গ্রিস, ইসরায়েল, ইতালি, জর্ডান ও ফিলিস্তিন থাকলেও তুরস্ককে বাইরে রাখা হয়েছে, যা বিভাজন আরও বাড়িয়েছে।
মিসরের সুবিধা অনেক হলেও তা একচ্ছত্র নয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি ও উৎপাদন হ্রাসের কারণে মিসর এখন নিজেই এলএনজি আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে নিজস্ব প্রসেসিং প্ল্যান্ট সচল রাখতে তাদের ইসরায়েল ও সাইপ্রাসের গ্যাসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে তুরস্কের নিজস্ব গ্যাস কম থাকলেও তাদের রয়েছে বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, এলএনজি টার্মিনাল ও ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। ফলে আঙ্কারা একটি আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। দুই দেশের কূটনৈতিক বরফ গলার পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কের বোটাশ ও মিসরের ইগাস যৌথ কাজের চুক্তি করে। এমনকি ২০২৫ সালের মে মাসে একটি চুক্তির অধীনে গ্রীষ্মের চাহিদা মেটাতে মিসরে একটি তুর্কি এফএসআরইউ জাহাজও পাঠানো হয়।
এই প্রেক্ষাপটে 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি' এক নতুন প্রতিরক্ষা মাত্রা যোগ করেছে। তিনটি দেশই এটিকে একটি আত্মরক্ষামূলক জোট হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং নতুন সদস্যদের জন্য এর দরজা খোলা রেখেছে। সম্মিলিত প্রতিরক্ষার অনুচ্ছেদের কারণে ন্যাটোর সঙ্গে এর তুলনা করা হচ্ছে, যদিও এই জোটের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামরিক সমন্বয় এখনো শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। আপাতত এই চুক্তিকে তিনটি আঞ্চলিক শক্তির একতাবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য হলো মার্কিন নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার মুখে নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং ইরান ও ইসরায়েলি প্রভাবকে মোকাবিলা করা।
এই চুক্তিতে জ্বালানি-সংক্রান্ত কোনো প্রকাশ্য অনুচ্ছেদ নেই। তবে প্রতিরক্ষার এই সমন্বয় সামুদ্রিক নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং বন্দর, পাইপলাইন, এলএনজি প্ল্যান্ট ও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা দিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জুনে ‘নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট’ প্রস্তাবিত ‘ফোর সিজ ইনিশিয়েটিভ’ বড় সুযোগের পাশাপাশি অতিরঞ্জিত আশার ঝুঁকিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এই প্রস্তাবে সিরিয়া ও তুরস্ককে মাধ্যম করে পারস্য উপসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরকে একটি বিশাল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর সম্ভাব্য উপাদানের মধ্যে রয়েছে উপসাগর-ভূমধ্যসাগর এবং ইরাক-সিরিয়া করিডর এবং বিখ্যাত ‘আরব গ্যাস পাইপলাইন’-এর পুনরুজ্জীবন।
এই মডেলে তুরস্ক হবে ইউরোপের প্রবেশদ্বার, উপসাগরীয় অঞ্চলের পুঁজি দিয়ে হবে পুনর্নির্মাণ, আর সিরিয়া পাবে মোটা অঙ্কের ট্রানজিট রাজস্ব। হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় বিকল্প স্থলপথ খোঁজার অংশ হিসেবে সৌদি-জর্ডান-সিরিয়া-তুরস্ক রেললাইনের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এর কোনোটিই এখনো অর্থায়িত জ্বালানি করিডর নয়। এই জোটের তিন অংশীদারের কাছে তিনটি ভিন্ন শক্তি রয়েছে: সৌদি আরবের অফুরন্ত অর্থ ও জ্বালানি, তুরস্কের কৌশলগত ভূরাজনীতি ও সামরিক শিল্প সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। এদের মেলাতে গেলে রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়েও বেশি কিছু লাগবে। সিরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, অনিশ্চিত আইনি ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা সংকট এখনো বড় বাধা।
নিরাপত্তা ও জ্বালানির এই জটিল সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে মিসর। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার অনানুষ্ঠানিক 'স্টেপ' বা 'কোয়াড' আলোচনায় মিসর অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলআত্তি জানিয়েছেন, কায়রো তাদের সংবিধান এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করে খুব গুরুত্বের সঙ্গে এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসরকে এই জোটের একটি স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কারিগরি বিষয়গুলো মিটে গেলে মিসর পরে এতে যোগ দিতে পারে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও এই সম্ভাবনার কথা নাকচ করেননি।
কায়রোর এই মেপে পা ফেলার বিষয়টি বোঝা সহজ। একটি কঠোর প্রতিরক্ষা চুক্তি মিসরকে ইরান, হুতি বা ইসরায়েল-সংক্রান্ত সংঘাতের মধ্যে টেনে আনতে পারে। এতে করে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিস, সাইপ্রাস, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও মিসরের জন্য অপরিহার্য। তবে এই চুক্তি যদি স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধের অঙ্গীকারের বদলে বিমান প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য ও অবকাঠামো রক্ষার মতো নমনীয় সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবেই এতে মিসরের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
মিসরকে এই জোটে টানার পেছনে আঙ্কারার স্বার্থ কেবল প্রদর্শনীমূলক নয়। মিসর এই জোটে এলে তাদের বিশাল সামরিক শক্তি, সুয়েজ খালের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগর—উভয় স্থানে শক্তিশালী উপস্থিতি যুক্ত হবে। এটি মূল জ্বালানি ও বাণিজ্যিক রুটগুলোতে জোটের প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তা ছাড়া এটি চার দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক আলোচনাকে একটি শক্ত রূপ দেবে এবং উপসাগর, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও ইউরোপের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে তুরস্কের দাবিকে শক্তিশালী করবে।
এখানে জ্বালানির হিসাবটাও খুব স্পষ্ট। মিসরের এলএনজি রূপান্তর কেন্দ্রগুলো তুরস্কের পাইপলাইন, গ্যাস ধারণক্ষমতা এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকারের সঙ্গে একদম মিলে যায়। দুই দেশের গভীর সমন্বয় এলএনজি বাণিজ্যকে অনেক সহজ করবে, মিসরের প্ল্যান্টগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং ইএমজিএফ থেকে বাদ পড়ার কারণে তৈরি হওয়া তুরস্কের আঞ্চলিক একাকিত্ব অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের জ্বালানি লড়াই এখন আর কেবল সমুদ্রের তলদেশের গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আসল কঠিন প্রশ্ন এখন দুটি: জ্বালানি কীভাবে বাজারে পৌঁছাবে এবং সেই অবকাঠামোর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে।





























