মেজর জাহিদ হত্যা ও ডিবি সেলে স্ত্রীর ওপর নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা
- আপডেট সময় : ০৮:৪৭:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

পিলখানা সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য সত্য জেনে ফেলাই কাল হয়েছিল মেধাবী সেনা কর্মকর্তা মেজর জাহিদুল ইসলামের (পরবর্তীতে মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত)। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয়, ওই রাতেই তার স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলাকে কোলের শিশুসহ তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ডিবি কার্যালয়ে এবং চালানো হয় পৈশাচিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। সম্প্রতি ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয়েছে, যা ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত উঠে এসেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের একটি বাসভবনে আলাপকালে শহীদ মেজর জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা তার স্বামীর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড এবং দীর্ঘ আট বছর ধরে ‘জঙ্গি’ তকমা নিয়ে বেঁচে থাকার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, স্বামীকে তুলে নেওয়ার রাতেই আট মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলায় পোকায় ভরা অত্যন্ত নোংরা একটি ঘরে টানা দুই দিন ও দুই রাত চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয় তাদের। নামাজ পড়ার জন্য একটু আড়াল তৈরি করতে একটি চাদর টাঙালেও ডিবি সদস্যরা সেটি ছিঁড়ে ফেলে দেয়। একই সময়ে তাদের ছয় বছরের শিশুকন্যাকে গণমাধ্যমের সামনে দাঁড় করিয়ে সাজানো হয়েছিল ‘জঙ্গি নাটক’।
মেজর জাহিদ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। বিএমএ লং কোর্সে তৃতীয় স্থান অর্জন করে তিনি ‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ গোল্ড মেডেল’ লাভ করেন। তিনি সিলেটের ৫২ পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর (বিএম) হিসেবে প্রায় তিন বছর, স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকসের ট্যাকটিকস উইংয়ে প্রায় তিন বছর এবং খাগড়াছড়ির ২০৩ ব্রিগেডে জিএসও-৩ হিসেবে প্রায় দুই বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তবে নিয়মিত নামাজ পড়া, দাড়ি রাখা এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার কারণে পরবর্তীতে তাকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয় এবং নানাভাবে মানসিক নির্যাতন করা হয়। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই তিনি সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।
অবসর নেওয়ার পর মেজর জাহিদ মিরপুরের রূপনগরের একটি ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট সেখানে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে তাকে হত্যা করে। বিগত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জানা যায়, রূপনগরের সেই ফ্ল্যাটে কোনো বন্দুকযুদ্ধই হয়নি। জাহিদের দুই হাত পেছনে শক্ত করে বেঁধে অত্যন্ত কাছ থেকে তার বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল। হত্যার আগে তার দুই হাত মুচড়ে ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যার ফলে হাত দুটি কেবল চামড়া ও পেশির সাহায্যে শরীরের সাথে ঝুলছিল। তার মুখমণ্ডল পৈশাচিক আঘাতে কালচে লাল হয়ে গিয়েছিল এবং চোখ দুটি কোটর থেকে বের হয়ে এসেছিল, যা অতিরিক্ত নির্যাতন ও শ্বাসরোধ করে হত্যার স্পষ্ট প্রমাণ।
হত্যাকাণ্ডের পর মেজর জাহিদের মরদেহ দীর্ঘ আড়াই বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ফেলে রাখা হয়। স্বজনরা কাছাকাছি থাকলেও জানতে পারেননি তার শেষ ঠিকানা কোথায়। অবশেষে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। অতি সম্প্রতি তাকে মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। রূপনগরের সে ফ্ল্যাটে কোনো বন্দুকযুদ্ধই হয়নি। মেজর জাহিদের দুই হাত পেছনে শক্ত করে বেঁধে অত্যন্ত কাছ থেকে বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল। হত্যার আগে তার দুই হাত মুচড়ে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ফলে হাত দুটি শুধু চামড়া ও পেশির সাহায্যে শরীরে ঝুলে ছিল। তার মুখমণ্ডল পৈশাচিক আঘাতে কালচে লাল এবং চোখ কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছিল, যা অতিরিক্ত টর্চার কিংবা শ্বাসরোধ করে হত্যার স্পষ্ট আলামত। হত্যার পর তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে ঢাকা মেডিকেল মর্গে আড়াই বছর ফেলে রাখা হয়। পরে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।



























