ঢাকা ০৪:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
এফবিআইয়ের হাজারো কর্মকর্তার সংবেদনশীল তথ্য চুরির দাবি হ্যাকারদের তেলুগু তারকা নানির ক্যারিয়ার, সম্পদ ও আসন্ন সিনেমার গল্প জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন সৌন্দর্যের ভেতর ইতিহাসের শরীর: হেগেল ও মার্কসের নন্দনতত্ত্বের তুলনামূলক পাঠ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই প্রতিহত করা হবে: এস এম জিলানী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা বনশ্রীতে কুকুরকে খাওয়াতে গিয়ে তরুণীকে মারধর, থানায় অভিযোগ ঈশ্বরদীতে ক্রেতা সেজে দুই ভরি স্বর্ণের মালা নিয়ে চম্পট গোপালগঞ্জে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ ইবির আইন অনুষদের ১৯ শিক্ষার্থী সিভিল জজ পদে মনোনীত

বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য সূচকে ৫৫ ধাপ পেছাল বাংলাদেশ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১১:৩৮:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নারী-পুরুষের সমতায় ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলেও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য সূচকে বড় পতন হয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সদ্য প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রতিবেদন ২০২৬’ অনুযায়ী, এক বছরে বাংলাদেশ ৫৫ ধাপ পিছিয়ে গেছে। ১৪৫টি দেশের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৯তম, যা গত ২০২৫ সালের সূচকে ছিল ২৪তম। তবে এই বড় পতনের পরও দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

ডব্লিউইএফের এই বার্ষিক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন—এই চার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার ব্যবধান পরিমাপ করা হয়েছে। এবার বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ২ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে স্কোর কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। প্রতিবেদনে এই পতনকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যতম বড় পতন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০০৬ সালের তুলনায় দেশের বর্তমান স্কোর এখনো ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

প্রতিবেদনের তথ্যগুলো বিভিন্ন সময়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর মধ্যে অর্থনীতি ও শিক্ষার তথ্য মূলত ২০২৩-২৫ সালের এবং স্বাস্থ্যের তথ্য ২০২১-২৪ সালের। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের হিসাব ১ জুন ২০২৬ এবং মন্ত্রিসভার হিসাব ১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বিবেচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ জুন ১৯৭৬ থেকে ১৫ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়কালের নারী সরকারপ্রধানের হিসাব নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রায় ৭ মাসের মেয়াদও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশের এই পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের স্কোরের বড় পতনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই খাতে বাংলাদেশের স্কোর ৭২ দশমিক ১ থেকে কমে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে এবং অবস্থান ৩য় থেকে ১২তম হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর গঠিত নতুন সংসদে নারীরা মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ আসন পেয়েছেন, যা এযাবৎকালের সর্বনিম্ন সমতার স্কোর এবং এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯তম। অন্যদিকে মন্ত্রিসভায় নারীর প্রতিনিধিত্ব ১৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হলেও গত দুই দশকে এই সমতার স্কোর ৯ দশমিক ১ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নারী সরকারপ্রধান থাকার কারণে বাংলাদেশ ২০১৯ সাল থেকে এই উপ-সূচকে পূর্ণ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে প্রথম স্থানে রয়েছে।

অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের দিক থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এই খাতে স্কোর ৪৫ দশমিক ৭ থেকে কমে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে এবং অবস্থান ১৪১তম থেকে ১৪২তম স্থানে নেমে গেছে। দেশে নারীর আনুমানিক বার্ষিক আয় ৪ হাজার ৬৭০ ডলার, যেখানে পুরুষের আয় ১২ হাজার ৪৪০ ডলার। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক পদে নারীর হার মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীর ক্ষেত্রে এই হার ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এ ছাড়া নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ হলেও পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কর্মজীবী নারীদের ৯৫ দশমিক ৯৭ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এবং ৫৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ খণ্ডকালীন কাজের সাথে যুক্ত।

এই বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিবেদনে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অবনতির চিত্র স্পষ্ট। শ্রমবাজারে নারীর কিছুটা অংশগ্রহণ থাকলেও জ্যেষ্ঠ বা নীতিনির্ধারণী পদে নারীদের উপস্থিতি একেবারেই কম। কাঠামোগত সমস্যার কারণে বাংলাদেশের স্কোর কমেছে ও অবস্থান পেছনে গেছে, তবে প্রতিবেশীদের চেয়ে বাংলাদেশ এখনো ভালো অবস্থানে রয়েছে।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, অর্থনীতিতে নারীদের সুযোগ কমেনি, বরং অংশগ্রহণ কমেছে। তৈরি পোশাক খাতে উদ্যোক্তারা নারী শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেন কারণ তাঁরা দায়িত্বশীল ও মনোযোগী। তবে বর্তমানে শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় নারীদের দলবদ্ধভাবে মেস বা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই সাথে সামাজিক ঝুঁকি, শারীরিক সুরক্ষা ও মানসিক চাপের কারণেও অনেকে শহরমুখী হতে চাচ্ছেন না। তবে গ্রামীণ অর্থনীতি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়লেও তা অনেক সময় আনুষ্ঠানিক হিসাবে উঠে আসে না।

শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। এই খাতে সমতার স্কোর এবার ৯৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ পূর্ণ সমতা অর্জন করলেও উচ্চশিক্ষায় এখনো ব্যবধান রয়েছে; যেখানে নারীর ভর্তির হার ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং পুরুষের ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। নারীর সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং পুরুষের ৮১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৯৬ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকলেও অবস্থান ১২৩তম থেকে ১২০তম হয়েছে। জন্মের সময় লিঙ্গ অনুপাতে বাংলাদেশ পূর্ণ সমতা অর্জন করলেও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ুর সমতা সামান্য কমেছে। বর্তমানে নারীর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ু ৬২ দশমিক ৯৮ বছর এবং পুরুষের ৬৩ দশমিক ১৪ বছর। এ ছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর বাল্যবিবাহ হয় এবং জীবদ্দশায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে সন্তান প্রসবের হার ৫৯ শতাংশ এবং প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ১১৫। নারীদের জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থাকলেও পুরুষদের জন্য কোনো পিতৃত্বকালীন ছুটি নেই। প্রতিবেদনে নারীর বিবাহবিচ্ছেদের অধিকারকে অসম এবং প্রজননস্বাধীনতাকে সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিক অবস্থানে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে মালদ্বীপ (১১৯তম), নেপাল (১২০তম), ভুটান (১২১তম), শ্রীলঙ্কা (১২৯তম), ভারত (১৩১তম) এবং পাকিস্তান (১৪৩তম)। ডব্লিউইএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান গতিতে এই অঞ্চলের লিঙ্গবৈষম্য পুরোপুরি দূর হতে আরও ১৪৯ বছর সময় লাগবে। বিশ্বব্যাপী এই সূচকে ৯৩ শতাংশ ব্যবধান দূর করে শীর্ষস্থানে রয়েছে আইসল্যান্ড। এরপরের অবস্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নামিবিয়া ও যুক্তরাজ্য। তালিকার সবচেয়ে নিচে রয়েছে চাদ (৫৭.৮ শতাংশ), যার ঠিক ওপরে রয়েছে ইরান ও পাকিস্তান। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে লিঙ্গবৈষম্যের ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ দূর হয়েছে, তবে পূর্ণ সমতা আসতে আরও ১২০ বছর লাগবে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য সূচকে ৫৫ ধাপ পেছাল বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ১১:৩৮:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নারী-পুরুষের সমতায় ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলেও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য সূচকে বড় পতন হয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সদ্য প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রতিবেদন ২০২৬’ অনুযায়ী, এক বছরে বাংলাদেশ ৫৫ ধাপ পিছিয়ে গেছে। ১৪৫টি দেশের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৯তম, যা গত ২০২৫ সালের সূচকে ছিল ২৪তম। তবে এই বড় পতনের পরও দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

ডব্লিউইএফের এই বার্ষিক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন—এই চার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার ব্যবধান পরিমাপ করা হয়েছে। এবার বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ২ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে স্কোর কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। প্রতিবেদনে এই পতনকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যতম বড় পতন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০০৬ সালের তুলনায় দেশের বর্তমান স্কোর এখনো ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

প্রতিবেদনের তথ্যগুলো বিভিন্ন সময়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর মধ্যে অর্থনীতি ও শিক্ষার তথ্য মূলত ২০২৩-২৫ সালের এবং স্বাস্থ্যের তথ্য ২০২১-২৪ সালের। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের হিসাব ১ জুন ২০২৬ এবং মন্ত্রিসভার হিসাব ১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বিবেচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ জুন ১৯৭৬ থেকে ১৫ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়কালের নারী সরকারপ্রধানের হিসাব নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রায় ৭ মাসের মেয়াদও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশের এই পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের স্কোরের বড় পতনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই খাতে বাংলাদেশের স্কোর ৭২ দশমিক ১ থেকে কমে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে এবং অবস্থান ৩য় থেকে ১২তম হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর গঠিত নতুন সংসদে নারীরা মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ আসন পেয়েছেন, যা এযাবৎকালের সর্বনিম্ন সমতার স্কোর এবং এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯তম। অন্যদিকে মন্ত্রিসভায় নারীর প্রতিনিধিত্ব ১৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হলেও গত দুই দশকে এই সমতার স্কোর ৯ দশমিক ১ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নারী সরকারপ্রধান থাকার কারণে বাংলাদেশ ২০১৯ সাল থেকে এই উপ-সূচকে পূর্ণ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে প্রথম স্থানে রয়েছে।

অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের দিক থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এই খাতে স্কোর ৪৫ দশমিক ৭ থেকে কমে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে এবং অবস্থান ১৪১তম থেকে ১৪২তম স্থানে নেমে গেছে। দেশে নারীর আনুমানিক বার্ষিক আয় ৪ হাজার ৬৭০ ডলার, যেখানে পুরুষের আয় ১২ হাজার ৪৪০ ডলার। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক পদে নারীর হার মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীর ক্ষেত্রে এই হার ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এ ছাড়া নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ হলেও পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কর্মজীবী নারীদের ৯৫ দশমিক ৯৭ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এবং ৫৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ খণ্ডকালীন কাজের সাথে যুক্ত।

এই বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিবেদনে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অবনতির চিত্র স্পষ্ট। শ্রমবাজারে নারীর কিছুটা অংশগ্রহণ থাকলেও জ্যেষ্ঠ বা নীতিনির্ধারণী পদে নারীদের উপস্থিতি একেবারেই কম। কাঠামোগত সমস্যার কারণে বাংলাদেশের স্কোর কমেছে ও অবস্থান পেছনে গেছে, তবে প্রতিবেশীদের চেয়ে বাংলাদেশ এখনো ভালো অবস্থানে রয়েছে।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, অর্থনীতিতে নারীদের সুযোগ কমেনি, বরং অংশগ্রহণ কমেছে। তৈরি পোশাক খাতে উদ্যোক্তারা নারী শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেন কারণ তাঁরা দায়িত্বশীল ও মনোযোগী। তবে বর্তমানে শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় নারীদের দলবদ্ধভাবে মেস বা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই সাথে সামাজিক ঝুঁকি, শারীরিক সুরক্ষা ও মানসিক চাপের কারণেও অনেকে শহরমুখী হতে চাচ্ছেন না। তবে গ্রামীণ অর্থনীতি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়লেও তা অনেক সময় আনুষ্ঠানিক হিসাবে উঠে আসে না।

শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। এই খাতে সমতার স্কোর এবার ৯৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ পূর্ণ সমতা অর্জন করলেও উচ্চশিক্ষায় এখনো ব্যবধান রয়েছে; যেখানে নারীর ভর্তির হার ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং পুরুষের ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। নারীর সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং পুরুষের ৮১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৯৬ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকলেও অবস্থান ১২৩তম থেকে ১২০তম হয়েছে। জন্মের সময় লিঙ্গ অনুপাতে বাংলাদেশ পূর্ণ সমতা অর্জন করলেও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ুর সমতা সামান্য কমেছে। বর্তমানে নারীর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ু ৬২ দশমিক ৯৮ বছর এবং পুরুষের ৬৩ দশমিক ১৪ বছর। এ ছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর বাল্যবিবাহ হয় এবং জীবদ্দশায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে সন্তান প্রসবের হার ৫৯ শতাংশ এবং প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ১১৫। নারীদের জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থাকলেও পুরুষদের জন্য কোনো পিতৃত্বকালীন ছুটি নেই। প্রতিবেদনে নারীর বিবাহবিচ্ছেদের অধিকারকে অসম এবং প্রজননস্বাধীনতাকে সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিক অবস্থানে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে মালদ্বীপ (১১৯তম), নেপাল (১২০তম), ভুটান (১২১তম), শ্রীলঙ্কা (১২৯তম), ভারত (১৩১তম) এবং পাকিস্তান (১৪৩তম)। ডব্লিউইএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান গতিতে এই অঞ্চলের লিঙ্গবৈষম্য পুরোপুরি দূর হতে আরও ১৪৯ বছর সময় লাগবে। বিশ্বব্যাপী এই সূচকে ৯৩ শতাংশ ব্যবধান দূর করে শীর্ষস্থানে রয়েছে আইসল্যান্ড। এরপরের অবস্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নামিবিয়া ও যুক্তরাজ্য। তালিকার সবচেয়ে নিচে রয়েছে চাদ (৫৭.৮ শতাংশ), যার ঠিক ওপরে রয়েছে ইরান ও পাকিস্তান। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে লিঙ্গবৈষম্যের ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ দূর হয়েছে, তবে পূর্ণ সমতা আসতে আরও ১২০ বছর লাগবে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo