সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ, সব ভবনে বসবে সৌর প্যানেল
- আপডেট সময় : ০২:২৮:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা এবং নিজস্ব চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভবনে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু দাপ্তরিক ভবনই নয়, এসব প্রতিষ্ঠানের অধীনস্থ মিলনায়তন, ডাকবাংলো এবং হাটবাজারের স্থায়ী শেডের ছাদেও সৌর প্যানেল বসাতে হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব চাহিদা মেটাবে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে রাজস্ব আয়ও করতে পারবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ গত ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর পৃথক চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের এই নির্দেশনা দিয়েছে। একই সঙ্গে অন্তত দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ‘ব্যাকআপ’ রাখার কথা বলা হয়েছে। দেশের চলমান বিদ্যুৎ-সংকটের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এই নির্দেশনা সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত কার্যকর হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নির্দেশনায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের গত ১ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনের সূত্র উল্লেখ করে চিঠিগুলোতে বলা হয়েছে, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দৈনন্দিন সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আমরা চাই, বিদ্যুতের সমস্যায় এসব সেবা যেন ব্যাহত না হয়। ভবনের ছাদ কাজে লাগিয়ে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ কমবে। ব্যাটারি ব্যাকআপ জরুরি কাজ চালু রাখতে সহায়তা করবে। আবার বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আয় করতে পারবে। শহর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আমরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্ষম করতে চাই।”
নির্দেশনা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনগুলোকে তাদের নিজস্ব ভবন, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের কার্যালয়, বাসভবন, মিলনায়তন, ডাকবাংলো ও অতিথিশালার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে হবে। করপোরেশনের অধীনস্থ মার্কেট-হাটবাজারের স্থায়ী শেডে আয়তন বিবেচনা করে এই ব্যবস্থা নিতে হবে। পৌরসভা ও জেলা পরিষদের ভবন, মিলনায়তন, ডাকবাংলোসহ অধীনস্থ মার্কেট-হাটবাজারের স্থায়ী শেডও এই নির্দেশনার আওতাভুক্ত। উপজেলা পরিষদ ভবনের পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান বা প্রশাসকের বাসভবন, কর্মচারীদের আবাসিক ভবন এবং অধীনস্থ হাটবাজারের স্থায়ী শেডে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের ভবনগুলোর ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করা হবে। আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব রাজস্ব কিংবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ এই খাতে ব্যয় করতে পারবে। যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, সেগুলো বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক-কারিগরি সহায়তায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে। প্যানেল স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছরের মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করার নির্দেশনাও রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিদ্যুৎ-সংকটের এই সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদ কাজে লাগানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলছেন, এতে আলাদা স্থান ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে এবং দিনের বেলায় প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপ্তরিক চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। তবে বিশেষজ্ঞরা ভবনের উপযোগিতা যাচাই, মানসম্মত যন্ত্রপাতি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁরা মনে করেন, উদ্যোগটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের সেবা নির্বিঘ্নে সচল থাকবে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ গত ১ সেপ্টেম্বর ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এই প্রণোদনা অনুযায়ী, নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়া হবে। এই বিশেষ দাম পেতে হলে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এই সময়ের পর তা বসালে বিশেষ সুবিধা মিলবে না। এই দামে বিদ্যুৎ কেনা হবে ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এবং বিদ্যুৎ বিক্রির টাকা প্রতি তিন মাস পরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এছাড়া সৌরবিদ্যুতের প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, মিটারসহ সব যন্ত্রপাতি সরকার নির্ধারিত মানের হতে হবে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে জানান, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আগে ছাদের কারিগরি উপযোগিতা যাচাইসহ নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দক্ষতার প্যানেলের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট ও লোকবল রাখতে হবে। এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিভাগে একটি তদারকি সেল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। মোয়াজ্জেম বলেন, কোন প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিয়েছে, কোথায় কাজ শেষ হয়েছে, কত বিদ্যুৎ নিজেরা ব্যবহার করছে, কতটা গ্রিডে যাচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করতে হবে। এসব তথ্য জাতীয় পর্যায়ে প্রকাশ করলে কত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরকারি ব্যয় সাশ্রয় হলো, তা সহজেই বোঝা যাবে।
এর আগেও সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আলোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ভবনে তিন হাজার মেগাওয়াটের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। একই বছরের আগস্টে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর এক বিশ্লেষণে একে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে সে সময়ও ভবনের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই, অর্থায়ন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।




























