বরমী বাজারের ‘রুটিমহল’: দাঁড়িপাল্লায় মেপে তন্দুর রুটি বিক্রির শতবর্ষী ঐতিহ্য
- আপডেট সময় : ০৮:৪৫:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

গাজীপুরের শ্রীপুরের ঐতিহ্যবাহী ও প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বরমী বাজারে শত বছর ধরে টিকে রয়েছে তন্দুর রুটির এক অনন্য ব্যবসা। এই বাজারের ফলপট্টির পাশের একটি সরু গলিতে পা রাখলেই চোখে পড়বে অন্য রকম এক ব্যস্ততা। স্থানীয় মানুষের কাছে এই গলিটি পরিচিত ‘রুটিমহল’ নামে। এখানকার রুটি বিক্রির পদ্ধতিটি বেশ ব্যতিক্রমী—এখানে তন্দুর রুটি বিক্রি করা হয় দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে। বর্তমানে এই গলিতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩টি রুটির দোকান রয়েছে। প্রতি বুধবার সাপ্তাহিক হাটের দিনে প্রতিটি দোকানেই ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে।
এই রুটিমহলেরই একজন পরিচিত ব্যবসায়ী বরমী গ্রামের কফিল উদ্দিন। টিনের তৈরি ছোট দোকানের সামনে বড় একটি টেবিলে সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকে তন্দুর রুটি ও জিলাপি। কফিল উদ্দিন দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের ডাকেন এবং ওজন করে রুটি মেপে দেন। আর তাঁর দুই ছেলে ও দুই সহকারী ব্যস্ত থাকেন দোকানে বসে খেতে আসা মানুষদের খাবার পরিবেশনে। গত বুধবার দুপুরে তাঁর দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরের কোনো বেঞ্চই খালি নেই। একজন খাওয়া শেষ করে উঠতেই অন্যজন বসে পড়ছেন, আবার অনেকেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন জায়গা খালি হওয়ার জন্য। হাটুরেদের পাশাপাশি অনেকেই বন্ধুবান্ধব নিয়ে কেবল এই রুটি খেতেই এখানে আসেন, আবার অনেকে পরিবারের জন্য কিনে নিয়ে যান।
দোকানের এক পাশে তৈরি করা বড় চুলার সামনে বসে অনবরত রুটি তৈরি করেন একজন কারিগর। প্রথমে আটার মণ্ড বেলে নেওয়ার পর হাতের আঙুলের বিশেষ কৌশলে সেটিকে আরও বড় ও পাতলা করা হয়। এরপর কাপড়ের তৈরি চ্যাপ্টা পাত্রে রেখে রুটিটি ঢুকিয়ে দেওয়া হয় উত্তপ্ত চুলার ভেতর। মুহূর্তের মধ্যে রুটি ফুলে উঠলে লোহার শিক দিয়ে তা বের করে রাখা হয় টেবিলে। সেখান থেকেই ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী রুটি মেপে দেওয়া হয়।
কফিল উদ্দিনের দোকানে প্রতি কেজি তন্দুর রুটি বিক্রি হয় ১২০ টাকায়। তবে কেউ যদি দোকানে বসে খেতে চান, তবে বড় রুটি ২০ টাকা এবং ছোট রুটি ১০ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি করা হয়। রুটির সঙ্গে ক্রেতাদের জন্য ডাল, সবজি ও শুকনা মরিচের ভর্তা দেওয়া হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। ওজন করে রুটি কিনলে তুলনামূলক কম দামে বেশি রুটি পাওয়া যায়। এক কেজিতে বড় রুটি পাওয়া যায় সাতটি এবং ছোট রুটি পাওয়া যায় প্রায় ১৩টির মতো। বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য যারা ওজন করে রুটি কেনেন, তাদেরও বিনামূল্যে ডাল, সবজি ও ভর্তা দেওয়া হয়।
শ্রীপুরের পুষাইদ গ্রাম থেকে বরমী বাজারে গরু কিনতে আসা মো. সুরুজ মিয়া হাটে যাওয়ার আগে রুটিমহলে বসে নাশতা করছিলেন। তিনি জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই বাজারে এলে রুটি কিনে বাড়ি নিয়ে যান। তবে কফিল উদ্দিনের দোকানের রুটির চাহিদা বরাবরই বেশি। শ্রীপুরের কাওরাইদ গ্রাম থেকে বন্ধুদের নিয়ে রুটি খেতে আসা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তন্দুর রুটি কেবল খাবার নয়, এটি বরমী বাজারের ঐতিহ্যের অংশ। অন্য জায়গায় তন্দুর রুটি পাওয়া গেলেও বরমীর রুটির স্বাদ একদম আলাদা, এটি অত্যন্ত নরম ও সুস্বাদু।
হাটের দিনগুলোতে কফিল উদ্দিনের ব্যস্ততা থাকে সবচেয়ে বেশি। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি হাটবারে তিনি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার তন্দুর রুটি বিক্রি করেন। তবে এখন আর কেবল হাটের দিনের ওপর নির্ভর করতে হয় না, চাহিদা বাড়ায় প্রতিদিনই রুটি তৈরি ও বিক্রি চলছে। কফিল উদ্দিন বলেন, প্রায় শত বছর ধরে তাঁদের পরিবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। তাঁর দাদার পর বাবা এবং এরপর তিনি নিজে এই ব্যবসার হাল ধরেছেন। এই রুটি বিক্রি করেই তাঁর সংসার চলে। তবে বর্তমানে রুটি তৈরির সব উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো বড় আকারের রুটি তৈরি করা সম্ভব হয় না। তারপরও পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্য ও রুটির আসল স্বাদ ধরে রাখতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।


























