ঢাকা ০১:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করছে সরকার: মাহদী আমিন রাঙামাটিতে সন্তানকে বাঁচিয়ে ডুবে গেলেন বাবা, ১৬ ঘণ্টা পর উদ্ধার শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আইনি প্রক্রিয়া চলছে: চিফ প্রসিকিউটর ঢাবির ফজলুল হক হলে প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ গ্যাস সংকটে ২৬ দিন ধরে বন্ধ ময়মনসিংহের বিদ্যুৎকেন্দ্র জনগণের স্বস্তির জন্য কাজ করছে বর্তমান সরকার: রুহুল কবির রিজভী বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, ৪ বিভাগে অতি ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস কুবিতে নতুন দুই সহকারী প্রক্টর নিয়োগ শ্রীপুরের জঙ্গলে ১২টি ঘোড়ার দেহাবশেষ, মাংস চুরির অভিযোগ টানা বৃষ্টিতে আবারও জলজটে স্থবির চট্টগ্রাম মহানগরী

ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিকতায় শরতের আগমনী বার্তা ও প্রকৃতির রূপ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩০:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আজি কি তোমার মধুর মূরতি হেরিনু শারদ প্রভাতে! হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ ঝলিতে অমল শোভাতে—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙক্তির মতোই বর্ষার ভেজা আবহ পেরিয়ে প্রকৃতিতে এখন ধীরে ধীরে বদলের আভাস স্পষ্ট। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা বাড়ছে, কোথাও কোথাও কাশফুল মাথা তুলছে। ভোরের বাতাসে পাওয়া যাচ্ছে শিউলির গন্ধ। রাজধানী শহরের ব্যস্ততার মধ্যেও প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছে, ঋতু পাল্টাচ্ছে।

বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী ভাদ্র ও আশ্বিন মাস নিয়ে শরৎকাল। এই ঋতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল, শিউলি, শিশির আর নির্মল আলোর ছবি। বর্ষার টানা বৃষ্টির পর প্রকৃতিতে কিছুটা স্বস্তি আসে। বিল-ঝিলের পানিতে শালুক-শাপলা, নদীর পাড়ে কাশবন আর খোলা আকাশের নিচে উড়ে বেড়ায় বকসহ নানা পাখি। দিগন্তবিস্তৃত মাঠে কচি ধানের হেলেদুলে কাটানো কৈশোর। এমন সবুজের সমারোহে কবিমন গেয়ে ওঠে—‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা। নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই—লুকোচুরি খেলা।’

এবার শরৎ এসেছে ভিন্ন এক সময়ে। গত দুই বছরে দেশের রাজনীতি ও সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। আন্দোলন, ক্ষমতার পরিবর্তন, নির্বাচন ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সেই পরিবর্তনের রেশ এখনো আছে মানুষের কথাবার্তায়, চিন্তায়, প্রত্যাশায়। এর মধ্যেই প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে শরৎ নিয়ে হাজির হয়েছে।

তবে শরৎ মানেই যে সব সময় মেঘমুক্ত আকাশ আর কোমল আবহাওয়া, তা নয়। ভাদ্রের গরম অনেক সময় বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। হঠাৎ বৃষ্টি নামে, আবার কিছুক্ষণ পরই দেখা দেয় ভ্যাপসা গরম। কোথাও কোথাও এই মাস ‘তালপাকা ভাদ্র’ নামেও পরিচিত। শরতের প্রথম সপ্তাহেও বর্ষার রেশ থাকবে। কখনো মেঘলা আকাশ, কখনো বৃষ্টি, আবার বৃষ্টির ফাঁকে রোদের দেখা—এভাবেই শুরু হতে পারে ঋতুটির প্রথম কদিন। আশ্বিনে অবশ্য আবহাওয়ায় কিছুটা বদল আসে। দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামে একটু আগেই, বাতাসেও টের পাওয়া যায় হিমেল ঋতুর আগমনী আভাস।

শরৎ ফুলেরও ঋতু। শিউলি, বেলি, দোলনচাঁপা, বকুল, মালতী, মধুমালতী, শাপলা ও পদ্ম—বিভিন্ন ফুল এ সময় প্রকৃতিকে আলাদা রূপ দেয়। শিউলির সঙ্গে শরতের সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর। ভোরে গাছতলায় ঝরে থাকা সাদা-কমলা শিউলি দেখলেই বোঝা যায়, শরৎ তার নিজের পরিচয় নিয়ে হাজির হয়েছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথায়—‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ, এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই।’

এই ঋতুর সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক আছে। হেমন্তকে বলা হয় ফসলের ঋতু আর শরৎ সেই ফসলের সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে। ধানখেতে শিষ আসতে শুরু করলে কৃষকের মনে জাগে নতুন আশার আলো। গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা ও লোকাচারেও শরতের প্রভাব আছে। উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় এখনো ‘ভাদর কাটানি’ নামে একটি লোকাচার প্রচলিত। ভাদ্র মাসের প্রথম তিন থেকে সাত দিন নববধূ যদি স্বামীর মুখ দেখেন, তবে অমঙ্গল হতে পারে, এমন বিশ্বাস থেকে শ্রাবণ মাসের শেষ দিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি চলে যান নববধূরা। এ দেশে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এই উৎসব উত্তরবঙ্গের দিকে বেশি হয়, দক্ষিণবঙ্গ বা অন্যান্য স্থানে ততটা নয়।

শরৎ আবার উৎসবের ঋতুও। শিউলির গন্ধের সঙ্গে আসে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। এরপর লক্ষ্মীপূজা, দীপাবলি। ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ। ফলে প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনেও তৈরি হয় আলাদা ব্যস্ততা ও আনন্দ। তবে আগের সেই শরৎ কি এখনো আছে? প্রশ্নটি উঠছে, কারণ নগরায়ণের চাপে কাশবন, খোলা মাঠ, জলাভূমি ও নাবাল জমি দ্রুত কমছে। ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ি, মিরপুর বেড়িবাঁধ, কেরানীগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের মাওয়া কিংবা আড়িয়ল বিলের মতো জায়গায় এখনো শরতের কিছু চেনা দৃশ্য পাওয়া যায়। ছুটির দিনে মানুষ সেখানে যায়, কাশফুলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে।

একসময় শরৎ দেখতে আলাদা করে কোথাও যেতে হতো না। বাড়ির পাশের মাঠ, পুকুরপাড় কিংবা গ্রামের পথেই তার দেখা মিলত। এখন শহুরে মানুষকে শরৎ খুঁজতে যেতে হয় শহরের প্রান্তে। প্রকৃতির আপন নিয়মে শরৎ আসে, আবার নিয়ম মেনেই তাকে বিদায় নিতে হয়। কিন্তু আমাদের হাতে কি থাকবে সেই শরৎকে ধরে রাখার মতো কিছু? তাই ঋতুটি চলে যাওয়ার আগে চারপাশে একটু তাকানো যেতে পারে। হয়তো দেখা যাবে, ব্যস্ত শহরের মধ্যেও শরৎ এখনো আছে কোনো একটুকরো নীল আকাশে, কাশফুলের দোলায় কিংবা ভোরের গন্ধে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিকতায় শরতের আগমনী বার্তা ও প্রকৃতির রূপ

আপডেট সময় : ০৯:৩০:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

আজি কি তোমার মধুর মূরতি হেরিনু শারদ প্রভাতে! হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ ঝলিতে অমল শোভাতে—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙক্তির মতোই বর্ষার ভেজা আবহ পেরিয়ে প্রকৃতিতে এখন ধীরে ধীরে বদলের আভাস স্পষ্ট। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা বাড়ছে, কোথাও কোথাও কাশফুল মাথা তুলছে। ভোরের বাতাসে পাওয়া যাচ্ছে শিউলির গন্ধ। রাজধানী শহরের ব্যস্ততার মধ্যেও প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছে, ঋতু পাল্টাচ্ছে।

বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী ভাদ্র ও আশ্বিন মাস নিয়ে শরৎকাল। এই ঋতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল, শিউলি, শিশির আর নির্মল আলোর ছবি। বর্ষার টানা বৃষ্টির পর প্রকৃতিতে কিছুটা স্বস্তি আসে। বিল-ঝিলের পানিতে শালুক-শাপলা, নদীর পাড়ে কাশবন আর খোলা আকাশের নিচে উড়ে বেড়ায় বকসহ নানা পাখি। দিগন্তবিস্তৃত মাঠে কচি ধানের হেলেদুলে কাটানো কৈশোর। এমন সবুজের সমারোহে কবিমন গেয়ে ওঠে—‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা। নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই—লুকোচুরি খেলা।’

এবার শরৎ এসেছে ভিন্ন এক সময়ে। গত দুই বছরে দেশের রাজনীতি ও সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। আন্দোলন, ক্ষমতার পরিবর্তন, নির্বাচন ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সেই পরিবর্তনের রেশ এখনো আছে মানুষের কথাবার্তায়, চিন্তায়, প্রত্যাশায়। এর মধ্যেই প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে শরৎ নিয়ে হাজির হয়েছে।

তবে শরৎ মানেই যে সব সময় মেঘমুক্ত আকাশ আর কোমল আবহাওয়া, তা নয়। ভাদ্রের গরম অনেক সময় বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। হঠাৎ বৃষ্টি নামে, আবার কিছুক্ষণ পরই দেখা দেয় ভ্যাপসা গরম। কোথাও কোথাও এই মাস ‘তালপাকা ভাদ্র’ নামেও পরিচিত। শরতের প্রথম সপ্তাহেও বর্ষার রেশ থাকবে। কখনো মেঘলা আকাশ, কখনো বৃষ্টি, আবার বৃষ্টির ফাঁকে রোদের দেখা—এভাবেই শুরু হতে পারে ঋতুটির প্রথম কদিন। আশ্বিনে অবশ্য আবহাওয়ায় কিছুটা বদল আসে। দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামে একটু আগেই, বাতাসেও টের পাওয়া যায় হিমেল ঋতুর আগমনী আভাস।

শরৎ ফুলেরও ঋতু। শিউলি, বেলি, দোলনচাঁপা, বকুল, মালতী, মধুমালতী, শাপলা ও পদ্ম—বিভিন্ন ফুল এ সময় প্রকৃতিকে আলাদা রূপ দেয়। শিউলির সঙ্গে শরতের সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর। ভোরে গাছতলায় ঝরে থাকা সাদা-কমলা শিউলি দেখলেই বোঝা যায়, শরৎ তার নিজের পরিচয় নিয়ে হাজির হয়েছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথায়—‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ, এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই।’

এই ঋতুর সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক আছে। হেমন্তকে বলা হয় ফসলের ঋতু আর শরৎ সেই ফসলের সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে। ধানখেতে শিষ আসতে শুরু করলে কৃষকের মনে জাগে নতুন আশার আলো। গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা ও লোকাচারেও শরতের প্রভাব আছে। উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় এখনো ‘ভাদর কাটানি’ নামে একটি লোকাচার প্রচলিত। ভাদ্র মাসের প্রথম তিন থেকে সাত দিন নববধূ যদি স্বামীর মুখ দেখেন, তবে অমঙ্গল হতে পারে, এমন বিশ্বাস থেকে শ্রাবণ মাসের শেষ দিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি চলে যান নববধূরা। এ দেশে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এই উৎসব উত্তরবঙ্গের দিকে বেশি হয়, দক্ষিণবঙ্গ বা অন্যান্য স্থানে ততটা নয়।

শরৎ আবার উৎসবের ঋতুও। শিউলির গন্ধের সঙ্গে আসে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। এরপর লক্ষ্মীপূজা, দীপাবলি। ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ। ফলে প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনেও তৈরি হয় আলাদা ব্যস্ততা ও আনন্দ। তবে আগের সেই শরৎ কি এখনো আছে? প্রশ্নটি উঠছে, কারণ নগরায়ণের চাপে কাশবন, খোলা মাঠ, জলাভূমি ও নাবাল জমি দ্রুত কমছে। ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ি, মিরপুর বেড়িবাঁধ, কেরানীগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের মাওয়া কিংবা আড়িয়ল বিলের মতো জায়গায় এখনো শরতের কিছু চেনা দৃশ্য পাওয়া যায়। ছুটির দিনে মানুষ সেখানে যায়, কাশফুলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে।

একসময় শরৎ দেখতে আলাদা করে কোথাও যেতে হতো না। বাড়ির পাশের মাঠ, পুকুরপাড় কিংবা গ্রামের পথেই তার দেখা মিলত। এখন শহুরে মানুষকে শরৎ খুঁজতে যেতে হয় শহরের প্রান্তে। প্রকৃতির আপন নিয়মে শরৎ আসে, আবার নিয়ম মেনেই তাকে বিদায় নিতে হয়। কিন্তু আমাদের হাতে কি থাকবে সেই শরৎকে ধরে রাখার মতো কিছু? তাই ঋতুটি চলে যাওয়ার আগে চারপাশে একটু তাকানো যেতে পারে। হয়তো দেখা যাবে, ব্যস্ত শহরের মধ্যেও শরৎ এখনো আছে কোনো একটুকরো নীল আকাশে, কাশফুলের দোলায় কিংবা ভোরের গন্ধে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo