ধান-সবজির চেয়ে গবাদিপশু পালনে ছয়গুণ বেশি আয় ক্ষুদ্র কৃষকের

- আপডেট সময় : ১১:২০:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ধান, সবজি বা অন্যান্য মৌসুমি ফসলের জায়গা দখল করে নিয়েছে গবাদিপশু, হাঁস ও মুরগি পালন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ইনকাম অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি অব স্মল-স্কেল ফুড প্রোডিউসার্স সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক জাতীয় জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে দেশের আট বিভাগের ১২ হাজার ৮৭৯টি কৃষি পরিবার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিবিএসের টেকসই কৃষি পরিসংখ্যান প্রকল্প এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
বিবিএসের তথ্যমতে, একজন ক্ষুদ্র কৃষক ধান ও সবজির মতো অস্থায়ী ফসল থেকে বছরে গড়ে যে আয় করেন, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন থেকে তাঁর আয় তার প্রায় ছয় গুণ। জরিপে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র কৃষকদের বার্ষিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। এর মধ্যে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি থেকে গড় আয় ২৮ হাজার ৪২১ টাকা, যেখানে ধান ও সবজি থেকে আয় মাত্র ৪ হাজার ৫৯১ টাকা। ফলদ ও স্থায়ী ফসল থেকে এই আয় আরও কম, মাত্র ২ হাজার ৩৩১ টাকা। তবে বনজ সম্পদ থেকে ১০ হাজার ৮৯২ টাকা এবং মাছ চাষ থেকে ১২ হাজার ৬৭০ টাকা আয় হয়।
জরিপে জমির পরিমাণ, গবাদিপশুর সংখ্যা এবং বছরে কৃষি থেকে আয়ের ভিত্তিতে দেশের সব কৃষককে তুলনা করা হয়েছে। এই তিনটি সূচকেই যাঁরা সবচেয়ে নিচের ৪০ শতাংশের মধ্যে রয়েছেন, তাঁদের ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে ধরা হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে আয়ের বড় পার্থক্য দেখা গেছে; যেখানে রাজশাহী বিভাগে বার্ষিক গড় আয় ৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা এবং খুলনা বিভাগে ৪৪ হাজার ২৮ টাকা, সেখানে সিলেট বিভাগে এই আয় মাত্র ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা। জরিপে এই আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণ বিশ্লেষণ করা না হলেও খুলনা অঞ্চলে হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খাতের বিস্তার এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উন্নত জাতের পশুর ক্ষেত্রে আয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু থেকে বছরে গড়ে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৩ টাকা এবং জার্সি বা ব্রাহমা জাতের গরু থেকে ২ লাখ ২ হাজার টাকা আয় সম্ভব। অথচ দেশি গরু থেকে আয় হয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৭৮ টাকা। দেশি ছাগল থেকে বছরে গড় আয় মাত্র ৪ হাজার ৯০২ টাকা। মুরগির ক্ষেত্রেও সোনালি জাত থেকে বছরে ৩৬ হাজার ৬৩৩ টাকা এবং ব্রয়লার থেকে ২৫ হাজার ৮৫৯ টাকা আয় হয়। তবে ক্ষুদ্র কৃষকদের উন্নত জাতের পশু কেনার মতো পুঁজি বা সহজ ঋণসুবিধা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। জরিপ অনুযায়ী, বৃহৎ উৎপাদকের গড় আয় বছরে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা, আর সব কৃষক মিলিয়ে গড় আয় ৭৮ হাজার ২৮৬ টাকা।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সাবেক মহাপরিচালক মো. শহজাহান কবীর বলেন, কৃষকের আয় কম হওয়ায় অনেকে কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়। তিনি আরও বলেন, কৃষকদের জায়গা নিচ্ছেন বড় বিনিয়োগকারীরা, যাঁরা কৃষিকে জীবিকা হিসেবে নয়, ব্যবসা হিসেবে দেখেন। এছাড়া বাজারব্যবস্থা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকেরা পণ্যের প্রকৃত মূল্য পান না। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সম্প্রতি আলুচাষির উদাহরণ দিয়ে বলেন, উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে থাকা অতিরিক্ত খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকের আয় কমে যাচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণাতেও একই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে কৃষক পর্যায়ে চালের দাম ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা হলেও ব্যাপারী, মিলার ও আড়তদার ঘুরে খুচরা বাজারে তা বেড়ে ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা হয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগির পরিচর্যা ও দুধ দোহনের মতো কাজে নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই শ্রমের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনো সীমিত। জরিপ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন নারী।



























