শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ আপাতত বন্ধ রাখছে সরকার

- আপডেট সময় : ১২:৪২:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

দেশে প্রতিবছর গ্যাসের গড় উৎপাদন দৈনিক ১৫ কোটি ঘনফুটেরও বেশি হারে কমছে। এই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়; বরং আমদানিতে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন নিয়মিত ব্যাহত হচ্ছে। এমতাবস্থায়, শিল্প খাতে নতুন করে গ্যাস সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুলাই বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হ্রাস এবং দুটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) ভিত্তিক এলএনজি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা থাকায় শিল্পে নতুন সংযোগের বিষয়টি আপাতত বিবেচনা করা হচ্ছে না। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান টার্মিনালের সম্মিলিত গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট হলেও, বর্তমানে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। এতে গত এক সপ্তাহ ধরে দেশের সব খাতেই গ্যাসের সংকট বেড়েছে।
শিল্পে গ্যাস সংযোগ বন্ধের বিষয়টি নতুন নয়। গ্যাস সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি কিছু কারখানায় সংযোগ দিলেও সেই কমিটির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত কমিটি তিতাস গ্যাসের ২৫টি সংযোগ অনুমোদন করলেও সেই কমিটিও পরে বাতিল করা হয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৭ মে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শিল্পে গ্যাস সংযোগ নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, নতুন কূপ খনন করেও উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না। এক দশকের ব্যবধানে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি কমেছে। ২০১৭ সালে দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হলেও ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। বর্তমানে আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন মিলিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অবকাঠামোর অভাবে আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত সাময়িক। সরকার ভোলা থেকে গ্যাস ঢাকায় আনার প্রক্রিয়া এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আনার মতো বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়লে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে সংযোগ দেওয়া হবে এবং যারা অনুমোদন নিয়ে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছেন, তারা অগ্রাধিকার পাবেন।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, গ্যাসের অভাবে অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখছে। নতুন সংযোগ দিলেও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ বাড়াতে অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার বা টার্মিনাল নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আনার পরিকল্পনাটি ছোট পরিসরের এবং এতে খরচও বেশি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুটি ভাসমান ও একটি স্থলভাগে টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অন্তর্বর্তী সরকার সামিটের চুক্তি বাতিল ও এক্সিলারেটের সঙ্গে চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া জিটিসিএল জানিয়েছে, মহেশখালী থেকে আসা পাইপলাইনগুলোর ব্যাস কম হওয়ায় আনোয়ারা স্টেশনের পর ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। বর্তমানে গ্যাসের ৪১ শতাংশ বিদ্যুৎ, ৩৬ শতাংশ শিল্প, ১১ শতাংশ গৃহস্থালি, ৬ শতাংশ সার, ৫ শতাংশ সিএনজি এবং ১ শতাংশ চা খাতে ব্যবহৃত হয়। পেট্রোবাংলা বলছে, প্রতিশ্রুত সংযোগগুলো দেওয়া হলে আরও ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে, যার সংস্থান আপাতত নেই।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, সরবরাহ বাড়িয়ে নতুন সংযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে, কিন্তু যারা ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সংযোগ না দিলে তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি বাড়ানোর অবকাঠামো বানাতে হবে, আপাতত কোনো মুক্তি নেই। সরকার বর্তমানে ১০০টি কূপ খনন এবং সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বানের মতো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এফএসআরইউ হলো ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট। আমদানি করা এলএনজি মজুত করে রূপান্তরের মাধ্যমে গ্যাসের পাইপলাইনে সরবরাহ করে এটি। কক্সবাজারের মহেশখালীতে সমুদ্রে ভাসমান এমন দুটি টার্মিনাল আছে। এ দুটি মিলে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। সর্বোচ্চ সরবরাহ করা হয় ১০৫ কোটি ঘনফুট। একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় এখন সরবরাহ হচ্ছে ৫০ কোটি ঘনফুটের কম। এতে এক সপ্তাহ ধরে দেশের সব খাতেই গ্যাসের সংকট বেড়ে গেছে।
তবে শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেও আমদানি থেকে সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি জিটিসিএল বলছে, মহেশখালী থেকে এলএনজি আনার জন্য দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন আছে। পাইপলাইন দুটি এসেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। এ দুটি পাইপলাইন দিয়ে ১৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। কিন্তু আনোয়ারা স্টেশন থেকে পরবর্তী পাইপলাইন দুটি সরু, অর্থাৎ ব্যাস কম। এ দুটিতে ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা যাবে না। আর গ্যাসের ব্যবহার মূলত আনোয়ারার পর থেকেই শুরু হয়। তাই সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে।

























