বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গড়ল সৌদি আরব

- আপডেট সময় : ১১:২৯:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে নিরাপদ নৌ-চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ সচল রাখতে নতুন একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ সৌদির নেতৃত্বাধীন এই জোটে অংশ নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে 'মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স' নামের এই জোট গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। মূলত যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জোটভুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্তকারী এই কৌশলগত সমুদ্রপথে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন নিরাপদ রাখাই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের তেল ও গ্যাস রপ্তানির একটি বড় অংশ আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হলেও সেখানকার অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে。
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের উপর্যুপরি হামলার কারণে বাব আল-মান্দেব, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরীয় রুটও চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত সপ্তাহে হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়, যার ফলে লোহিত সাগরমুখী তেল পরিবহন ব্যাহত হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়লেও সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের শোধনাগার থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহন অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সেই তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথের ইয়েমেন অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখানে জাহাজে হামলার ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে গঠিত জোটে সৌদি আরব ছাড়া অন্য সদস্য দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরাস। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান এখনো এই জোটে যোগ দেয়নি, যদিও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংকটে তাদের নিরাপত্তা স্বার্থও একই ধরনের।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় জাতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর অন্যান্য দেশের জন্যও এই জোটে যোগদানের সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে। জোটের সদর দপ্তর সৌদি আরবেই স্থাপন করা হবে, তবে এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। জোট গঠনের বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। যদিও লোহিত সাগরে ইইউর নিজস্ব 'অ্যাসপিডিস' নামের একটি নৌ নিরাপত্তা মিশন রয়েছে, তবে নতুন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের কার্যক্রম কীভাবে আলাদা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অংশগ্রহণকারী দেশগুলো বিশ্বাস করে যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা একটি যৌথ দায়িত্ব এবং আন্তঃদেশীয় সামুদ্রিক হুমকি মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। জোটে কোন দেশ কতটি যুদ্ধজাহাজ বা বিমান দিয়ে সহায়তা করবে, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা, সমন্বিত মহড়া এবং সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। সৌদি আরব জোর দিয়ে বলেছে, এই জোটের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে গঠন করা হয়নি।

























