ঢাকা ০২:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান কখনো মাথা নত করবে না: পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিরসনে নতুন আশাবাদ, নিউইয়র্কে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নিউইয়র্কে মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রাতরাশ বৈঠক ডেঙ্গু ও হাম প্রতিরোধে ব্যর্থতার সুযোগ নেই: রুহুল আমিন হাওলাদার রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে পাঁচ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর নাটোর সদর উপজেলায় বক্তব্য দেওয়ার সময় মারা গেলেন মাদ্রাসা শিক্ষক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাঁচ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিলেন ইরানি প্রেসিডেন্ট ওমান উপকূলে মিসাইল হামলার কবলে বাংলাদেশি নাবিকদের জাহাজ

বর্ষার বিপুল জলরাশি কেন ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৮:১৫:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬ ৪৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



বর্ষা মানেই বাংলাদেশে এখন আতঙ্ক, জলাবদ্ধতা আর ফসলহানির গল্প। অথচ পবিত্র কোরআনে বৃষ্টিকে রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২ হাজার ২০ থেকে ২ হাজার ৩২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা আমাদের পৃথিবীর অন্যতম বৃষ্টিবহুল দেশ হিসেবে পরিচিত করে। বর্ষায় যে পরিমাণ পানি পড়ে, তার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ধরে রাখতে পারলেও দেশের বার্ষিক পানির চাহিদার বড় অংশ মেটানো সম্ভব হতো। কিন্তু বর্ষা শেষ হতেই পানির সংকটে পড়তে হয় আমাদের। এটি প্রকৃতির ব্যর্থতা নয়, বরং পুরোপুরি পরিকল্পনার অভাব।

পানি ব্যবস্থাপনা এখন কেবল পরিবেশ নয়, অর্থনীতিরও একটি বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকার জলাবদ্ধতা ও যানজটে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জলবায়ু ও পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় বাংলাদেশের জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গাছ লাগানোর ক্ষেত্রেও ভুল নীতি অনুসরণ করছি আমরা। হিজল, বরুণ, কদম, তাল, করচ বা বটের মতো দেশীয় গাছ গভীর মূলতন্ত্রের মাধ্যমে মাটিতে পানির পথ তৈরি করে ভূগর্ভস্থ পানি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। কিন্তু আমরা রাস্তার পাশে ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি লাগাচ্ছি। একটি ইউক্যালিপটাস গাছ প্রতিদিন ৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানি শুষে নেয় এবং মাটি শুকিয়ে দেয়। ভারতের রাজস্থানে বছরে মাত্র ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, অথচ দেশীয় গাছ ও ঐতিহ্যবাহী পানি সংরক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৬ থেকে ১৫ মিটার উপরে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে। আমরা তাদের চেয়ে সাত গুণ বেশি বৃষ্টি পেয়েও পানির সংকটে ভুগছি।

ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ২৩ লাখ ঘনমিটার পানি ভূগর্ভ থেকে তোলা হচ্ছে, কিন্তু কংক্রিটের আধিক্যের কারণে তা আর নিচে ফিরতে পারছে না। ১৯৯৬ সালে ঢাকার পানির স্তর ছিল ৮৬ মিটারে, যা ২০২৪ সালে নেমে গেছে ৮৬ মিটারে। বর্তমানে প্রতিবছর এই স্তর ২ থেকে ৩ মিটার করে নিচে নামছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকার উপরিভাগের জলাধার শুষ্ক মৌসুমে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। ঢাকা ওয়াসা তাদের চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পানি ভূগর্ভ থেকে সংগ্রহ করে।

সমাধানের পথ জটিল নয়। একটি এক হাজার বর্গফুটের ছাদ থেকে বছরে প্রায় এক লাখ লিটার বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা সম্ভব। সিঙ্গাপুর এই পদ্ধতিতে তাদের চাহিদার ৪০ শতাংশ মেটাচ্ছে। জাপানের টোকিওতে নতুন ভবনে বৃষ্টির পানি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। এছাড়া মাটিতে ৩ থেকে ৫ ফুট গর্ত করে বালু ও নুড়ি ভরে দিলে পানি সরাসরি ভূগর্ভে প্রবেশ করে। রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকলেও ২০২৩ পর্যন্ত ঢাকার ৯২ শতাংশ নতুন ভবনে তা নেই, কারণ জরিমানার পরিমাণ মাত্র ৫০ হাজার টাকা।

উপকূলীয় অঞ্চলের চিত্র আরও নির্মম। সেখানে লবণাক্ততার কারণে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নলকূপের পানি খাওয়ার অযোগ্য। ইউএনডিপির ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, উপকূলীয় পাঁচটি জেলার ৭৩ শতাংশ পরিবার অনিরাপদ পানি পান করছে, যা বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অকালপ্রসবের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লবণাক্ততা ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। সাতক্ষীরার শ্রীফলতলায় সমবায় ভিত্তিতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মডেলটি জাতীয়ভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন ছিল আরও ১০ বছর আগে।

মাটির স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের আদর্শ মাত্রা ৩ থেকে ৫ শতাংশ থাকা উচিত, অথচ বাস্তবে তা ১ শতাংশের নিচে। গবেষণায় দেখা যায়, মাটিতে প্রতি ১ শতাংশ জৈব পদার্থ বাড়ালে প্রতি হেক্টরে দেড় লাখ লিটার বাড়তি পানি ধরে রাখা সম্ভব। এছাড়া ঢাকার খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় ঢাকায় ৭৫টি খাল থাকলেও এখন টিকে আছে মাত্র ২৬টি। ড্রেন বড় করা সমাধান নয়, বরং নেদারল্যান্ডসের মতো পানিকে পথ করে দিতে হবে এবং জলাধারগুলোকে পার্কে রূপান্তর করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

বর্ষার বিপুল জলরাশি কেন ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০৮:১৫:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

বর্ষা মানেই বাংলাদেশে এখন আতঙ্ক, জলাবদ্ধতা আর ফসলহানির গল্প। অথচ পবিত্র কোরআনে বৃষ্টিকে রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২ হাজার ২০ থেকে ২ হাজার ৩২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা আমাদের পৃথিবীর অন্যতম বৃষ্টিবহুল দেশ হিসেবে পরিচিত করে। বর্ষায় যে পরিমাণ পানি পড়ে, তার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ধরে রাখতে পারলেও দেশের বার্ষিক পানির চাহিদার বড় অংশ মেটানো সম্ভব হতো। কিন্তু বর্ষা শেষ হতেই পানির সংকটে পড়তে হয় আমাদের। এটি প্রকৃতির ব্যর্থতা নয়, বরং পুরোপুরি পরিকল্পনার অভাব।

পানি ব্যবস্থাপনা এখন কেবল পরিবেশ নয়, অর্থনীতিরও একটি বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকার জলাবদ্ধতা ও যানজটে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জলবায়ু ও পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় বাংলাদেশের জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গাছ লাগানোর ক্ষেত্রেও ভুল নীতি অনুসরণ করছি আমরা। হিজল, বরুণ, কদম, তাল, করচ বা বটের মতো দেশীয় গাছ গভীর মূলতন্ত্রের মাধ্যমে মাটিতে পানির পথ তৈরি করে ভূগর্ভস্থ পানি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। কিন্তু আমরা রাস্তার পাশে ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি লাগাচ্ছি। একটি ইউক্যালিপটাস গাছ প্রতিদিন ৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানি শুষে নেয় এবং মাটি শুকিয়ে দেয়। ভারতের রাজস্থানে বছরে মাত্র ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, অথচ দেশীয় গাছ ও ঐতিহ্যবাহী পানি সংরক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৬ থেকে ১৫ মিটার উপরে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে। আমরা তাদের চেয়ে সাত গুণ বেশি বৃষ্টি পেয়েও পানির সংকটে ভুগছি।

ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ২৩ লাখ ঘনমিটার পানি ভূগর্ভ থেকে তোলা হচ্ছে, কিন্তু কংক্রিটের আধিক্যের কারণে তা আর নিচে ফিরতে পারছে না। ১৯৯৬ সালে ঢাকার পানির স্তর ছিল ৮৬ মিটারে, যা ২০২৪ সালে নেমে গেছে ৮৬ মিটারে। বর্তমানে প্রতিবছর এই স্তর ২ থেকে ৩ মিটার করে নিচে নামছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকার উপরিভাগের জলাধার শুষ্ক মৌসুমে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। ঢাকা ওয়াসা তাদের চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পানি ভূগর্ভ থেকে সংগ্রহ করে।

সমাধানের পথ জটিল নয়। একটি এক হাজার বর্গফুটের ছাদ থেকে বছরে প্রায় এক লাখ লিটার বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা সম্ভব। সিঙ্গাপুর এই পদ্ধতিতে তাদের চাহিদার ৪০ শতাংশ মেটাচ্ছে। জাপানের টোকিওতে নতুন ভবনে বৃষ্টির পানি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। এছাড়া মাটিতে ৩ থেকে ৫ ফুট গর্ত করে বালু ও নুড়ি ভরে দিলে পানি সরাসরি ভূগর্ভে প্রবেশ করে। রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকলেও ২০২৩ পর্যন্ত ঢাকার ৯২ শতাংশ নতুন ভবনে তা নেই, কারণ জরিমানার পরিমাণ মাত্র ৫০ হাজার টাকা।

উপকূলীয় অঞ্চলের চিত্র আরও নির্মম। সেখানে লবণাক্ততার কারণে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নলকূপের পানি খাওয়ার অযোগ্য। ইউএনডিপির ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, উপকূলীয় পাঁচটি জেলার ৭৩ শতাংশ পরিবার অনিরাপদ পানি পান করছে, যা বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অকালপ্রসবের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লবণাক্ততা ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। সাতক্ষীরার শ্রীফলতলায় সমবায় ভিত্তিতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মডেলটি জাতীয়ভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন ছিল আরও ১০ বছর আগে।

মাটির স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের আদর্শ মাত্রা ৩ থেকে ৫ শতাংশ থাকা উচিত, অথচ বাস্তবে তা ১ শতাংশের নিচে। গবেষণায় দেখা যায়, মাটিতে প্রতি ১ শতাংশ জৈব পদার্থ বাড়ালে প্রতি হেক্টরে দেড় লাখ লিটার বাড়তি পানি ধরে রাখা সম্ভব। এছাড়া ঢাকার খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় ঢাকায় ৭৫টি খাল থাকলেও এখন টিকে আছে মাত্র ২৬টি। ড্রেন বড় করা সমাধান নয়, বরং নেদারল্যান্ডসের মতো পানিকে পথ করে দিতে হবে এবং জলাধারগুলোকে পার্কে রূপান্তর করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo