ত্রিশালে খীরু নদীর জরাজীর্ণ ব্রিজ যেন মৃত্যুফাঁদ, আইনি জটে বন্ধ নতুনটি
- আপডেট সময় : ০২:৩০:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার পোড়াবাড়ি এলাকায় খীরু নদীর ওপর নির্মিত পুরনো ব্রিজটি এখন স্থানীয় লাখো মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নাম। সাধারণ মানুষের নিরাপদে যাতায়াতের মাধ্যম হওয়ার কথা থাকলেও এটি এখন এক ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে এবং একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় কেউ হারিয়েছেন প্রিয় স্বজনকে, আবার কেউবা সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই বেহাল ব্রিজটি ঘিরে প্রশাসনিক চরম গাফিলতি ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার চিত্র ফুটে উঠেছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
গত শুক্রবার (০২ অক্টোবর) স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে এই পুরাতন ব্রিজটি দ্রুত সংস্কার এবং পাশে নির্মিত নতুন ব্রিজটি অবিলম্বে চালু করার দাবি জানান। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম তার বুকে চেপে থাকা কষ্ট নিয়ে বলেন, "আমার ভাইকে হারিয়েছি এই ব্রিজে! কিছুদিন পূর্বে এখানে একটি ঘোড়াও মারা গেছে। একের পর এক মানুষ পা হারিয়ে আজ পথে বসেছে।" খীরু নদীর এই জরাজীর্ণ ব্রিজের কারণে কত পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
ব্রিজের এই বেহাল দশার কারণে শিশু ও শিক্ষার্থীরাও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। স্থানীয় স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আবিদ জানায়, "ঐ দিন আমি সাইকেল নিয়ে পড়ে গেছিলাম। এখন ব্রিজটা ঠিক না করলে মুরুব্বিদের চলতে সমস্যা হয়। আমরাও যাইতে পারি না।"
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও এই এলাকার মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে আক্ষেপ করেন স্থানীয় বাসিন্দা হাবিব মিয়া। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "দেশে তিনটি সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কিংবা খীরু নদীর এই ব্রিজের কোনো পরিবর্তন হয়নি! মানুষ হিসেবে আমরা সত্যিই দুঃখিত ও লজ্জিত। আমরা চাই বর্তমান সরকার যেন অনতিবিলম্বে এই জনগুরুত্বপূর্ণ ব্রিজের কাজটা শেষ করে দেয়।"
শুধু সাধারণ পথচারী বা শিক্ষার্থীরাই নন, এই জরাজীর্ণ ব্রিজ দিয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন মহলকেও। এলাকার মঠবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক, যিনি নিজেকে বর্তমান সরকারি দলের একজন কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন, নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, "প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াতের সময় এই ব্রিজের ওপর দিয়েই যেতে হয়। দলীয় পরিচয় যাই থাকুক, প্রতিদিন একদম অসহায়ত্বের মতো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। এখানে প্রতিনিয়ত নানা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আমি চাই দ্রুততম সময়ে এই ব্রিজটির জরুরি সংস্কার করা হোক।"
জীবিকার তাগিদে এই নড়বড়ে ব্রিজে প্রতিদিন যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ। স্থানীয় ভ্যান চালক রিপন মিয়া দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "পেটের তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন এই ব্রিজে ভ্যান চালাতে হয়। কত লোককে চোখের সামনে এই ব্রিজের কারণে পঙ্গু হয়ে যেতে দেখলাম! কিন্তু আমাদের এই দুর্ভোগ দেখার যেন কেউ নেই।"
অথচ এই দুর্ভোগের বিপরীত পাশে রয়েছে প্রশাসনিক উদাসীনতার এক অদ্ভুত চিত্র। খীরু নদীর ওপর আরেকটি নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও তা জনগণের কোনো কাজেই আসছে না। ময়মনসিংহ জেলা ও ত্রিশাল উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি এবং সদিচ্ছার অভাবেই নতুন নির্মিত অবকাঠামোটি অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী দায়সারা বক্তব্য দিয়ে নিজের দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসনাত জাহান খান জানান, "এই ব্রিজের পাশেই আরেকটি নতুন ব্রিজ করা হয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণ আইনি জটিলতার জন্য তা চালু করতে পারছি না। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে খুব দ্রুতই একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" স্থানীয়দের এখন একটাই দাবি, আইনি সব বাধা দূর করে অবিলম্বে নতুন ব্রিজটি যাতায়াতের জন্য খুলে দেওয়া হোক এবং ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো অংশটির স্থায়ী সংস্কার করা হোক।
স্থানীয় স্কুলের ৫ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী আবিদ বলেন, ঐ দিন আমি সাইকেল নিয়ে পড়ে গেছিলাম। এখন ব্রিজটা ঠিক না করলে মুরুব্বিদের চলতে সমস্যা হয়। আমরাও যাইতে পারি না।




























