দেশে প্রয়োজনীয় সব টিকা পাওয়া শিশুর হার কমেছে, প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
- আপডেট সময় : ১০:০৭:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মান আগের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব কটি টিকা পাওয়া শিশুর হার হ্রাস পাচ্ছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগের কথা। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে দেশে হামের মতো অন্যান্য সংক্রামক রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় যৌথ মূল্যায়ন দল তাদের অনুসন্ধানের এ তথ্য উপস্থাপন করে। ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার—যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন জনস্বাস্থ্যবিদ—এই ৭০ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দলের নেতৃত্ব দেন। এতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক মঞ্চ গ্যাভির প্রতিনিধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নয়টি দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করা এই বিশেষজ্ঞ দলের একটি কেন্দ্রীয়ভাবে এবং বাকি আটটি দল দেশের আট বিভাগে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ চালায়। তারা উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশে কোনো জাতীয় টিকানীতিই নেই; যদিও ২০১৩ সালে একটি খসড়া নীতি তৈরি করা হয়েছিল, তা আজও অনুমোদিত হয়নি।
যৌথ মূল্যায়ন দল কার্যক্রমে নানা অর্জনের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সাবেক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে টিকাদান কর্মসূচি যেভাবে চালিত হয়েছে বা হচ্ছে, তার সার্বিক চিত্র তুলে ধরেছে। মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিসিজি, পেন্টা ৩ এবং হাম-রুবেলার টিকা পাওয়া শিশুদের 'পূর্ণ সুরক্ষিত' বা ফুল্লি ইমিউনাইজড চিলড্রেন ধরা হয়। ২০১৬ সালে দেশে পূর্ণ সুরক্ষিত শিশুর হার ছিল ৮২.৩ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে বেড়ে ৮৩.৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১.৬ শতাংশে, অথচ সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা হলো ৯৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হাম-রুবেলার টিকা পাওয়া থেকে বাদ পড়েছে ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু। ফলে হাম-রুবেলার পাশাপাশি হুপিং কাশি ও ডিফথেরিয়ার সুরক্ষাতেও বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সব শিশুকে টিকা দিতে না পারার ব্যর্থতার পরিণতিতে ২০২৬ সালে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। দুর্বল স্থানীয় পরিকল্পনার কারণে প্রতিবছর টিকা পাওয়ার উপযুক্ত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। পরিদর্শনে কোল্ড চেইনে গুরুতর ত্রুটি লক্ষ করেছেন বিশেষজ্ঞরা; কোনো কোনো স্থানে টিটেনাস-ডিফথেরিয়ার (টিডি) টিকা জমাট বাঁধা অবস্থায় বা ব্যবহারযোগ্যতার বিচারে দ্বিতীয় স্তরে পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বিতরণকালে তাপমাত্রা সঠিকভাবে তদারকি না করা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার অসংগতি ধরা পড়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে ১৯৮৫ সালের চাহিদানুযায়ী নির্ধারিত পুরোনো জনবলকাঠামোকে দায়ী করা হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কাজের জটিলতা বাড়লেও কাঠামো সমন্বয় করা হয়নি, ফলে ইপিআইয়ের বিভিন্ন স্তরের অনুমোদিত পদের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পদই এখন শূন্য। স্বাস্থ্য সহকারী, পরিদর্শক, ডেটা কর্মী, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, স্টোরকিপার, কোল্ড-চেইন টেকনিশিয়ান ও পোর্টারসহ নানা পদে জনবলসংকটে স্থানীয় টিকাদান পরিকল্পনা, বাদ পড়া শিশু চিহ্নিতকরণ ও তদারকি মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।
পরবর্তী মাসের মাঝামাঝি সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিয়ে মতামত নেবে বিশেষজ্ঞ দল। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ প্রস্তাব করেছে। আগামী ছয় মাসের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ওয়ার্ডভিত্তিক স্থানীয় টিকাদান পরিকল্পনা গ্রহণ (যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে), শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ প্রদান এবং নিয়মিত টিকাদানের বয়সসীমা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৬ থেকে ২৪ মাসের মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপে ২০ ২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক কৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে জাতীয় টিকা কৌশলপত্র হালনাগাদ, জেলা ও জেলাপর্যায়ের নিচে এবং শহরাঞ্চলে জবাবদিহি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, স্কুলে ভর্তির আগে টিকাদানের তথ্য যাচাই, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারের সঙ্গে নতুন জনবলকাঠামো প্রণয়ন, সব কর্মকাণ্ড একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) আওতায় আনা, নজরদারির জন্য পৃথক স্বাস্থ্যকর্মী দল গঠন এবং জাতীয় পর্যায় ছাড়াও হাম-রুবেলা ও পোলিও পরীক্ষাগার সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
মূল্যায়ন দলের এই উদ্বেগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্রতিবেদনটি তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে পাননি। তবে হাতে পাওয়ার পর তারা জনস্বাস্থ্যবিদ ও নাইট্যাগের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে শূন্য পদগুলোতে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে এবং টিকাদানকারীদের জন্য প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন, খোলা স্থান বা অতিরিক্ত রোদ ও তাপমাত্রা রয়েছে এমন স্থানে আর কোনো টিকাকেন্দ্র রাখা হবে না। এছাড়া টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে 'বাফার স্টক' গড়ে তোলার পৃথক পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এর মধ্যে আছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে জাতীয় টিকা কৌশলপত্র হালনাগাদ ও সম্প্রসারণ, জেলা পর্যায়ে ও জেলার নিচের এলাকা সমন্বয় ও জবাবদিহি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, শহরাঞ্চলে টিকাদানের জবাবদিহি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, শিশুর স্কুলে ঢোকার আগে সে টিকা পাওয়া কি না, তা জানার ব্যবস্থা চালু করা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার বর্তমান সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইপিআয়ের জনবল কাঠাতো তৈরি করা, ইপিআইয়ের সব কর্মকাণ্ডকে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) মধ্যে আনা, সব স্তরের কর্মকর্তা–কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।.হামের প্রাদুর্ভাব একটি পরীক্ষা।


























