পাহাড়ে জুমের সোনালী ধানের হাসি, ভালো ফলনের আশা চাষিদের
- আপডেট সময় : ০৯:০৩:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

সবুজ পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন সোনালী রঙের আবহ। বাতাসে দুলছে আধা পাকা জুমের ধানের শিষ, আর তার সাথে মিশে আছে পাহাড়ি চাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও তৃপ্তির সুবাস। কোথাও চলছে ধান কাটার ব্যস্ততা, কোথাও ফসল রক্ষা করতে জুমঘরে নির্ঘুম রাত কাটানো, আবার কোথাও সাথি ফসল ঘরে তোলার ধুম। বৈশাখের প্রথম বর্ষণে বোনা পাহাড়িদের সেই স্বপ্নগুলো ভাদ্রের রোদে এখন সোনালী ফসলে রূপ নিয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জুমচাষিদের ঘরে ঘরে এখন বেঁচে থাকার নতুন আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশ। বান্দরবানের লামা উপজেলার চিংকুম ম্রো পাড়ায় গিয়ে দেখা যায় এক প্রাণবন্ত চিত্র। সেখানে পাহাড়ি ঢালে তৈরি বাঁশের মাচাং ঘরে বসে জুমের ফসল পাহারা দিচ্ছেন চিংরুং ম্রো। অবসরের পর ঘরে বসে না থেকে তিনি আবার ফিরে গেছেন নিজের ঐতিহ্যবাহী জুমের মাঠে। চলতি মৌসুমে তিনি তিন একর জমিতে জুমের আবাদ করেছেন।
প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা সত্ত্বেও ফলন নিয়ে বেশ আশাবাদী চিংরুং ম্রো। তিনি বলেন, আগে সময়মতো রোদ ও বৃষ্টি হলে জুমের ধান চমৎকার হতো। কিন্তু এখন আর সময়মতো রোদ-বৃষ্টি পাওয়া যায় না, প্রকৃতি যেন বদলে গেছে। তা সত্ত্বেও এবারের ফলন নিয়ে তিনি আশাবাদী। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নিজের জমি থেকে ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
জুম চাষের বহুমুখী উপযোগিতা তুলে ধরে চিংরুং ম্রো আরও জানান, জুমে শুধু ধানই উৎপাদিত হয় না। এর পাশাপাশি বেগুন, মারফা, তিল, যব, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ ও রোজেলাসহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের সাথি ফসল পাওয়া যায়। ফলে বাজার থেকে তাদের কেবল লবণ আর নাপ্পি (এক ধরনের পাহাড়ি শুঁটকি) কিনতে হয়। জুমের জমি যেন তাদের জন্য আস্ত একটা বাজার। বাবার সাথে এই জুম পাহারা দেওয়ার কাজে হাত লাগিয়েছে তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে চম্পা ম্রো। সে জানায়, জুম চাষ না করলে তাদের খাওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। এটি তাদের ঐতিহ্য এবং প্রতিবছরই তারা জুম চাষ করে থাকেন।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সাথে জুমের এই চক্রটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে জঙ্গল নির্বাচন করার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর জানুয়ারিতে ঝোপঝাড় কাটা, মার্চ-এপ্রিলে ‘ফায়ারিং লাইন’ তৈরি করে আগুন দিয়ে তা পোড়ানো এবং বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিপাতে বীজ বপন করা হয়। আগস্টের শেষভাগ থেকে শুরু করে অক্টোবর পর্যন্ত চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ। এরপর অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত প্রতিটি পাহাড়ি পাড়ায় নতুন চালের নবান্ন উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।
লামা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অঞ্জুশ্রী চৌধুরী জানান, চলতি বছর লামা উপজেলায় ২ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ করা হয়েছে। জুমের জমিতে ধানের পাশাপাশি চাষিরা বিভিন্ন ধরনের সাথি ফসলও উৎপাদন করেন। ফলন কেমন হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার জুমের ভালো ফলন পাওয়ার আশা রয়েছে। তবে পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সব জায়গায় সমান বৃষ্টিপাত হয় না। এ কারণে একেক এলাকায় ফলনের তারতম্য দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রিংচুম মুরুংয়ের মতে, পাহাড়ের আদি বাসিন্দাদের কাছে জুম কেবল এক টুকরো জমি বা সাধারণ ফসল নয়। জুম হলো তাদের অস্তিত্ব, বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সংস্কৃতির এক অমলিন ধারা।




























