ঢাকা ০৬:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বেতাগীতে জেন্ডার সমতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতামূলক সভা বিমান বাংলাদেশ: ঢাকা-টরন্টোর অভিজ্ঞতা থেকে ঢাকা-নিউইয়র্কের সম্ভাবনা রপ্তানি খাতের গতি বাড়াতে ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ছাড় নরসিংদীতে মানব পাচার প্রতিরোধ ও সারভাইভারদের পুনর্বাসনে কর্মশালা দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৩৮২ কোটি ডলার দিল্লির রাজপথে অস্থিরতা ও একচিলতে আশার আলো কিডনি বিক্রি করেও কাটল না অভাব, চুরির মামলায় গ্রেপ্তার যুবক চকরিয়ায় সড়ক দখলমুক্ত করতে দুই শতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদ শুটিংয়ের সেটে বড় বিপদের মুখে অভিনেতা ইমরান হাশমি বগুড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের হাজারো ঘর এখন মাদকসেবীদের আস্তানা

তাঁতের শব্দ স্তব্ধ—রাজবাড়ীর বাহলডাঙ্গায় মুছে যাচ্ছে এক ঐতিহ্য

মোঃ মকবুলার রহমান নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ১০:২৯:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫ ২২৫ বার পড়া হয়েছে

তাঁতের শব্দ স্তব্ধ—রাজবাড়ীর বাহলডাঙ্গায় মুছে যাচ্ছে এক ঐতিহ্য

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি




মোঃ মকবুলার রহমান নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার বাহলডাঙ্গা কারিগরপাড়া। নামেই যার পরিচয়—তাঁতশিল্পই এই গ্রামের শিকড়। এক সময় এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই ঘুরত তাঁতের চরকা, আঙিনা ভরে থাকত সুতো আর তাঁতের আওয়াজে মুখর থাকত চারদিক। এখন সেই আওয়াজ নিস্তব্ধ, চরকাগুলো থেমে গেছে।

এই গ্রামের ৬৫ বছরের আহমেদ শেখ একসময় আঙিনার তিনটি তাঁতে লুঙ্গি ও গামছা বুনে সংসার চালাতেন। বাবার কাছ থেকেই উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিলেন এই পেশা। যদিও আয় খুব বেশি ছিল না, তবে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে চলতে পারতেন সম্মানের সঙ্গেই।

কিন্তু সময় বদলেছে, লুঙ্গির বাজার সঙ্কুচিত হয়েছে, মুনাফা দাঁড়িয়েছে টানাপোড়েনে। তাঁতের কাজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন আহমেদ। এখন নিজের উঠানে পাটকাঠি আর পলিথিনে ছাওয়া অস্থায়ী চায়ের দোকানই তার অবলম্বন। মাটির চুলায় কেটলি বসিয়ে গাঁয়ের মানুষের হাতে তুলে দেন এক কাপ গরম চা।

‘তাঁতের পেশায় আর লাভ নেই। বাধ্য হয়ে ছেড়েছি। ছেলেরাও অন্য পেশায় গিয়েছে,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন আহমেদ।

শুধু আহমেদ নন, বাহলডাঙ্গার প্রায় ২০০ পরিবার আজ তাঁতের পেশা থেকে মুখ ফিরিয়েছে। শত শত বছর ধরে চলে আসা পেশাটি আজ অস্তিত্বের লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে।

এখন হাতে গোনা কয়েকটি ঘরেই হয় তাঁতের কাজ। গ্রামের একটি বাড়ির টিনের চালাঘরে ৭০ বছর বয়সী জালাল উদ্দিন শেখ এখনও গামছা বুনছেন। পাশে বসে তার পুত্রবধূ জুঁথি খাতুন চরকায় সুতো কাটছেন। জালাল বললেন, ‘এক সময় প্রতিটি বাড়িতে তাঁত ছিল, এখন হয়তো আট–দশটি চালু আছে। সারাদিন খেটে খরচ বাদ দিয়ে ২০০ টাকাও থাকে না হাতে।’

জুঁথি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে বিয়ের পর এ পরিবারে এসে তাঁতের কাজ শিখেছেন। বললেন, ‘স্বামী তাঁতের আয় দিয়ে কিছু করতে পারেন না। এখন পাবনায় বড় তাঁত কারখানায় কাজ করছেন।’

তাঁতশিল্পে আশার আলো জ্বালাতে চেয়েও জ্বলে উঠছে না। গ্রামেরই আরেক গৃহবধূ, ৪২ বছর বয়সী নাজমা খাতুন পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে বসিয়েছেন বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম। বললেন, ‘এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। এখন সেই ঋণের কিস্তি শোধ করাই কষ্ট।’

তার স্বামী ইউনুস শেখ জানান, সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তাঁরা দুজনই কাজ করেন। তবুও সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে হাতে থাকে মাত্র ৫০০ টাকা। ‘আমার সন্তানদের এই পেশায় আনতে চাই না। যত কষ্টই হোক, তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছি।’

তাঁতিরা ঋণগ্রস্ত, বাজার নেই, আর আগ্রহী শ্রমিকও কম। ৫৯ বছর বয়সী শুকুর আলী বলেন, ‘আমার বাবা একবার সরকারি ঋণ পেয়েছিলেন—৩৫ বছর আগে। তারপর আর কেউ কিছু পায়নি। এখন কেউ সুতা কিনতে চায়, তাকে মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা ধার করতে হয়।’

স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. আজমল আল বাহার বলেন, ‘বাহলডাঙ্গার তাঁত ঐতিহ্য ২০০ বছরের বেশি পুরনো। বহুবার উপজেলা সভায় বিষয়টি তুলেছি। কিন্তু কোনো উদ্যোগ নেই। যদি এখনই কিছু না করা হয়, তাহলে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।’

পাংশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আবু দারাদ জানান, তাঁত বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা এলেও পরে কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। অথচ এই শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজন জরুরি সহায়তা—বিশেষত সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তি।

এই সংকট শুধু বাহলডাঙ্গায় নয়—সারা দেশেই তাঁতের অবস্থা করুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ১৯৯০ সালে দেশে তাঁতের সংখ্যা ছিল দুই লাখের বেশি, আর ২০১৮ সালে তা নেমে এসেছে এক লাখের নিচে। অর্থাৎ ২৮ বছরে হারিয়ে গেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ তাঁত।

ভাঙ্গা তাঁত বোর্ডের এক কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বললেন, ‘রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে তাঁতির সংখ্যা কমছে। কারণ, সুতার দাম বেড়েছে, শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।’

ফরিদপুরের কানাইপুরের মফিজুল ইসলাম বললেন, ‘বাবা চালাতেন তিনটি তাঁত, আমি এখন কোনোমতে একটি চালাই। সুতার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ, শ্রমিক নেই।’

মাদারীপুরের কালকিনির রাশিদা বেগম বলেন, ‘আগে কাপড় বিক্রি হতো, এখন মানুষ মেশিনে তৈরি সস্তা কাপড় চায়। আমাদের হাতে তৈরি কাপড় টিকে থাকতে পারছে না।’

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক রতন চন্দ্র সাহা জানান, তাঁতিদের জীবনমান উন্নয়নে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তবে বাহলডাঙ্গার পরিস্থিতি বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে প্রশ্ন জাগে—বাহলডাঙ্গা কি তবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে যাচ্ছে? এই শতবর্ষী তাঁতপল্লী কি হারিয়ে যাবে একেবারেই?

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

 

তাঁতের শব্দ স্তব্ধ—রাজবাড়ীর বাহলডাঙ্গায় মুছে যাচ্ছে এক ঐতিহ্য

আপডেট সময় : ১০:২৯:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫

মোঃ মকবুলার রহমান নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার বাহলডাঙ্গা কারিগরপাড়া। নামেই যার পরিচয়—তাঁতশিল্পই এই গ্রামের শিকড়। এক সময় এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই ঘুরত তাঁতের চরকা, আঙিনা ভরে থাকত সুতো আর তাঁতের আওয়াজে মুখর থাকত চারদিক। এখন সেই আওয়াজ নিস্তব্ধ, চরকাগুলো থেমে গেছে।

এই গ্রামের ৬৫ বছরের আহমেদ শেখ একসময় আঙিনার তিনটি তাঁতে লুঙ্গি ও গামছা বুনে সংসার চালাতেন। বাবার কাছ থেকেই উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিলেন এই পেশা। যদিও আয় খুব বেশি ছিল না, তবে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে চলতে পারতেন সম্মানের সঙ্গেই।

কিন্তু সময় বদলেছে, লুঙ্গির বাজার সঙ্কুচিত হয়েছে, মুনাফা দাঁড়িয়েছে টানাপোড়েনে। তাঁতের কাজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন আহমেদ। এখন নিজের উঠানে পাটকাঠি আর পলিথিনে ছাওয়া অস্থায়ী চায়ের দোকানই তার অবলম্বন। মাটির চুলায় কেটলি বসিয়ে গাঁয়ের মানুষের হাতে তুলে দেন এক কাপ গরম চা।

‘তাঁতের পেশায় আর লাভ নেই। বাধ্য হয়ে ছেড়েছি। ছেলেরাও অন্য পেশায় গিয়েছে,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন আহমেদ।

শুধু আহমেদ নন, বাহলডাঙ্গার প্রায় ২০০ পরিবার আজ তাঁতের পেশা থেকে মুখ ফিরিয়েছে। শত শত বছর ধরে চলে আসা পেশাটি আজ অস্তিত্বের লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে।

এখন হাতে গোনা কয়েকটি ঘরেই হয় তাঁতের কাজ। গ্রামের একটি বাড়ির টিনের চালাঘরে ৭০ বছর বয়সী জালাল উদ্দিন শেখ এখনও গামছা বুনছেন। পাশে বসে তার পুত্রবধূ জুঁথি খাতুন চরকায় সুতো কাটছেন। জালাল বললেন, ‘এক সময় প্রতিটি বাড়িতে তাঁত ছিল, এখন হয়তো আট–দশটি চালু আছে। সারাদিন খেটে খরচ বাদ দিয়ে ২০০ টাকাও থাকে না হাতে।’

জুঁথি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে বিয়ের পর এ পরিবারে এসে তাঁতের কাজ শিখেছেন। বললেন, ‘স্বামী তাঁতের আয় দিয়ে কিছু করতে পারেন না। এখন পাবনায় বড় তাঁত কারখানায় কাজ করছেন।’

তাঁতশিল্পে আশার আলো জ্বালাতে চেয়েও জ্বলে উঠছে না। গ্রামেরই আরেক গৃহবধূ, ৪২ বছর বয়সী নাজমা খাতুন পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে বসিয়েছেন বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম। বললেন, ‘এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। এখন সেই ঋণের কিস্তি শোধ করাই কষ্ট।’

তার স্বামী ইউনুস শেখ জানান, সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তাঁরা দুজনই কাজ করেন। তবুও সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে হাতে থাকে মাত্র ৫০০ টাকা। ‘আমার সন্তানদের এই পেশায় আনতে চাই না। যত কষ্টই হোক, তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছি।’

তাঁতিরা ঋণগ্রস্ত, বাজার নেই, আর আগ্রহী শ্রমিকও কম। ৫৯ বছর বয়সী শুকুর আলী বলেন, ‘আমার বাবা একবার সরকারি ঋণ পেয়েছিলেন—৩৫ বছর আগে। তারপর আর কেউ কিছু পায়নি। এখন কেউ সুতা কিনতে চায়, তাকে মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা ধার করতে হয়।’

স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. আজমল আল বাহার বলেন, ‘বাহলডাঙ্গার তাঁত ঐতিহ্য ২০০ বছরের বেশি পুরনো। বহুবার উপজেলা সভায় বিষয়টি তুলেছি। কিন্তু কোনো উদ্যোগ নেই। যদি এখনই কিছু না করা হয়, তাহলে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।’

পাংশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আবু দারাদ জানান, তাঁত বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা এলেও পরে কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। অথচ এই শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজন জরুরি সহায়তা—বিশেষত সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তি।

এই সংকট শুধু বাহলডাঙ্গায় নয়—সারা দেশেই তাঁতের অবস্থা করুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ১৯৯০ সালে দেশে তাঁতের সংখ্যা ছিল দুই লাখের বেশি, আর ২০১৮ সালে তা নেমে এসেছে এক লাখের নিচে। অর্থাৎ ২৮ বছরে হারিয়ে গেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ তাঁত।

ভাঙ্গা তাঁত বোর্ডের এক কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বললেন, ‘রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে তাঁতির সংখ্যা কমছে। কারণ, সুতার দাম বেড়েছে, শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।’

ফরিদপুরের কানাইপুরের মফিজুল ইসলাম বললেন, ‘বাবা চালাতেন তিনটি তাঁত, আমি এখন কোনোমতে একটি চালাই। সুতার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ, শ্রমিক নেই।’

মাদারীপুরের কালকিনির রাশিদা বেগম বলেন, ‘আগে কাপড় বিক্রি হতো, এখন মানুষ মেশিনে তৈরি সস্তা কাপড় চায়। আমাদের হাতে তৈরি কাপড় টিকে থাকতে পারছে না।’

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক রতন চন্দ্র সাহা জানান, তাঁতিদের জীবনমান উন্নয়নে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তবে বাহলডাঙ্গার পরিস্থিতি বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে প্রশ্ন জাগে—বাহলডাঙ্গা কি তবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে যাচ্ছে? এই শতবর্ষী তাঁতপল্লী কি হারিয়ে যাবে একেবারেই?