ফিলিস্তিন রক্ষার দায়বদ্ধতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
- আপডেট সময় : ০৮:১৫:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে পরিচালিত ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’-এর তিন বছর পূর্ণ হয়েছে গত ৭ অক্টোবর। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ওই হামলার পর থেকে ইসরাইলের নির্বিচার বিমান হামলা ও স্থল অভিযানে পুরো গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাইলের পর মাইলজুড়ে হাজার হাজার ভবন, বাড়িঘর ও স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরাইলের সামরিক অভিযানে ৭৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে নিহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন এবং আহত হয়েছেন প্রায় দুই লাখ মানুষ।
অব্যাহত হামলার কারণে ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি আশ্রয়হীন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। গত তিন বছরে ইসরাইলি বাহিনীর এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাস্তুভিটায় তাঁবু টানিয়েও দীর্ঘদিন থাকতে পারেননি। বারবার এলাকা পরিবর্তনে বাধ্য হওয়ার কারণে তাদের জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। কিন্তু তারপরও বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নেই। পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর প্রায় কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। গাজা উপত্যকার পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করেছে ইসরাইল। জাতিসংঘের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে গাজার ৮৪ শতাংশ পরিবার গুরুতর পানি সংকটে ছিল এবং আগস্টে তা বেড়ে ৯১ শতাংশে পৌঁছায়।
নির্বিচার হামলা ও গণহত্যা সত্ত্বেও গত তিন বছরে ইসরাইল গাজায় বিজয় অর্জন করতে পারেনি। এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের জীবন রক্ষা, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং ইসরাইলি দখলদারত্বের অবসানের মতো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিকল্প হিসেবে কোনো কূটনৈতিক ঘোষণা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ফিলিস্তিনিদের নির্মূলের ইতিহাস কেবল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে শুরু হয়নি; ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’র পর থেকেই ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, কৃষিজমি দখল এবং পশ্চিমতীরকে খণ্ডবিখণ্ড করার ঘটনা তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৭০ সালের ৩০ নভেম্বর গৃহীত ২৬৪৯ নম্বর প্রস্তাব, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর গৃহীত ২৭৮৭ নম্বর প্রস্তাব, ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর গৃহীত ৩০৭০ নম্বর প্রস্তাব এবং ১৯৭৩ সালের ১২ ডিসেম্বর গৃহীত ৩১০৩ নম্বর প্রস্তাব ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মুক্তির সংগ্রামের বৈধতাকে স্বীকৃতি দেয়। এই প্রস্তাবগুলো ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার দাবিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে গণ্য করার বিরোধিতা করে। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭, ৫৫, ৫৬ ও ৫৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরাইল বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং খাদ্য, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ করতে বাধ্য।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা চালানোর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতি’ হিসেবে অভিহিত করাটা ভুক্তভোগীদের মানবিক সত্তাকে অস্বীকার করার শামিল। ৭ অক্টোবর হামলার তিন বছর পূর্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব শক্তি ইসরাইলকে অস্ত্র ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে, তাদের ভূমিকার পর্যালোচনার দাবি রাখে। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগ্রাম আজও টিকে আছে নিজেদের ভিটেমাটি আঁকড়ে থাকা পরিবার, স্বাস্থ্যকর্মী ও সাংবাদিকদের দৃঢ়সংকল্পের মাধ্যমে। নাগরিক সমাজকে অবশ্যই সরকারগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি ও মানবিক সংস্থাগুলোকে সহায়তা করতে হবে।




























