অর্থনৈতিক চাপে কোণঠাসা ইরান: কোন পথে হাঁটবে তেহরান?
- আপডেট সময় : ০৯:০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইরানের সামনে পথ ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে। যদিও তেহরান শেষ পর্যন্ত লড়াই ও প্রতিরোধের কথা বলে আসছে, তবে ওয়াশিংটন তাদের রণকৌশল বদলে সরাসরি সামরিক হামলার পরিবর্তে ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার পথে এগিয়েছে। এই কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র বেশ সফল হয়েছে বলে খোদ ইরানি কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে। মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের তেল রপ্তানি কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে পেরেছে। ব্রাসেলসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২৯ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৮ দিনে ওই অঞ্চল থেকে দৈনিক অন্তত ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও হালকা তরল পেট্রোলিয়াম রপ্তানি হয়েছে, যা যুদ্ধপূর্ব গড়ের সমান।
অর্থনৈতিক চাপের এই প্রভাব মুদ্রাবাজারে স্পষ্ট। রয়টার্সের ৩ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, খোলাবাজারে এক ডলার কিনতে প্রায় ২৬ লাখ ৮৮ হাজার ইরানি রিয়াল ব্যয় করতে হচ্ছে। গত এক বছরে রিয়ালের মান অর্ধেকেরও বেশি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। মুদ্রার এই পতন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০০ কোটি ডলার বা ২ বিলিয়ন ডলার বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ায় এ বছরের শুরুতে যে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, সেই অস্থিরতার আশঙ্কা এখনো কাটেনি।
ওয়াশিংটন কেবল তেলের পথই বন্ধ করেনি, বরং ১ অক্টোবর থেকে 'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট'-এর আওতায় নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে ইরানের গাড়ি, রেল, উৎপাদন ও ইস্পাত খাতে বিদেশি সরবরাহকারীরা ঝুঁকিতে পড়েছে। বিদেশি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের সঙ্গে লেনদেন করলে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারানোর আশঙ্কায় বাণিজ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংকটের গভীরতা স্বীকার করে ৩ অক্টোবর সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই বলেছেন, ইরান তার সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি পার করছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা এখনো অর্থনীতির আসন্ন পতনের পূর্বাভাস প্রত্যাখ্যান করছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে তেহরান যুদ্ধের পরিধি বাড়িয়ে দিতে পারে। চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিল ও এনার্জি অ্যাসপেক্টসের রিচার্ড ব্রোঞ্জ সতর্ক করেছেন যে, হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমছে বুঝতে পারলে ইরান বৃহত্তর সংঘাত উসকে দিতে পারে।
ইরানের জন্য হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতও একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মক্কা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায়, হুতিদের মিত্র হিসেবে ইরানকে নতুন এই ত্রিদেশীয় জোটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে ১০ হাজার অতিরিক্ত সেনা ও ৪টি বিমানবোঝাই অস্ত্র পাঠিয়েছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে আলোচনার কথা বলছেন, অন্যদিকে সামরিক হুমকিও জারি রেখেছেন। টাইম ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানকে ধ্বংস করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৯ হাজার নাবিক ও মেরিনসহ অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে, যার মধ্যে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরিও রয়েছে।
তবে এত উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ইরান একটি প্রস্তাব দিয়েছে এবং কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। তেহরান জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতার ভিত্তিতে সাতটি শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, কে আগে ছাড় দেবে—ইরান নিষেধাজ্ঞা থেকে রেহাই ও আটকে থাকা অর্থের মুক্তি চাইছে, আর ওয়াশিংটন চাইছে গ্রহণযোগ্য অঙ্গীকার। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প একটি 'অক্টোবর সারপ্রাইজ' তৈরির চেষ্টা করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।



























