ডেঙ্গুর কোনো চেনা লক্ষণই ছিল না চিকিৎসক দম্পতির মেয়ের, তিন দিনেই সব শেষ
- আপডেট সময় : ০৮:১৪:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

ডেঙ্গু নিয়ে কেউ পরামর্শ চাইলে চিকিৎসক মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান সব সময় বলতেন পেটে ব্যথা, রক্ত বমি কিংবা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোর দিকে কড়া নজর রাখতে। কিন্তু তাঁর নিজের আট বছর বয়সী মেয়ে ফামইয়া মাশনুর রুমাইসার ক্ষেত্রে এসবের কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। অবস্থা যে আশঙ্কাজনক দিকে যাচ্ছে, তা বোঝার সামান্য সুযোগটুকুও পাননি পেশায় চিকিৎসক এই মা-বাবা। মাত্র তিন দিনের জ্বরে আক্রান্ত হয়ে না-ফেরার দেশে চলে গেছে তাদের আদরের বড় মেয়ে রুমাইসা।
ফামইয়া মাশনুর রুমাইসার বয়স হয়েছিল ৮ বছর ১০ মাস ১৪ দিন। সে রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের বনশ্রী শাখার তৃতীয় শ্রেণির (ইংলিশ ভার্সন) শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। মা ফারজানা সুলতানা চক্ষুবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন রাজধানীর ভিশন আই হাসপাতালে। চিকিৎসকদের এই পরিবারের বড় সন্তান ছিল রুমাইসা। আগামী ১৭ নভেম্বর নিজের জন্মদিন উদযাপনের জন্য কক্সবাজার ভ্রমণ, কেক কাটা এবং পরিবারের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোর অনেক পরিকল্পনা করে রেখেছিল সে। মায়ের সঙ্গে গিয়ে জন্মদিনে পরার জন্য নিজের ও ছোট বোনের জন্য জামাও কিনে রেখেছিল আগেভাগেই।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার রাতে রুমাইসা প্রথম জানায় তার জ্বর জ্বর লাগছে। পরদিন সোমবার সকালে জ্বর বাড়লে সে আর স্কুলে যেতে পারেনি। মঙ্গলবার পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। এরপর বাসায় ক্যানুলা করে তাকে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছিল। বুধবার বাবা ওমর ফারুক জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে থাকায় সেদিন নতুন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এর আগে রুমাইসার মায়েরও ডেঙ্গু হয়েছিল এবং বাসায় স্যালাইনসহ সাধারণ চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। তবে মেয়ের ক্ষেত্রে সেই একই ব্যবস্থা কোনো কাজে আসেনি।
বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই রুমাইসা জানায় তার খুব খারাপ লাগছে। এরপরই তার শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বনশ্রীর একটি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা পিআইসিইউ ছিল না। এরপর আরেকটি হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে স্কয়ার হাসপাতালে পিআইসিইউর সন্ধান মেলে। তবে তীব্র যানজট পেরিয়ে সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রুমাইসার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। স্কয়ার হাসপাতালের পিআইসিইউতে নেওয়ার আধা ঘণ্টাও পার হতে পারেনি, তার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শিশুটি। অথচ এর আগপর্যন্ত সে সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছে, এমনকি তার দাদির পাঠানো ডাবের পানিও খেয়েছে।
রুমাইসার চলে যাওয়ার পর পুরো পরিবারে নেমে এসেছে স্তব্ধতা। তার ছোট বোন, ৫ বছর ৮ মাস বয়সী ফারজিন মাহনুর ওয়ারিসা সারাক্ষণ বড় বোনের সঙ্গেই থাকত। বড় বোনই তাকে গোসল করিয়ে দিত। বোন কোথায় চলে গেছে তা বুঝতে না পেরে সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তাকে বলা হয়েছে তার প্রিয় ‘ইয়া’ (বোনকে সে এই নামে ডাকত) আল্লাহর কাছে চলে গেছে। মা ফারজানা সুলতানা সারা ঘরে মেয়ের রেখে যাওয়া স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। রুমাইসা নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে ভালোবাসত, সহজে কিছু ফেলতে চাইত না। এখন সেই সাজানো ঘরজুড়ে কেবলই তার স্মৃতি।
শোকাতুর এই মা-বাবা এখন ভাগ্যের লিখন ও মেয়ের আয়ু এতটুকুই ছিল বলে নিজেদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। গত বছর এই সময়ে পুরো পরিবার মিলে হজে গিয়েছিলেন এবং গত জুলাই মাসে সাজেক ভ্যালিতে বেড়াতে গিয়ে তোলা সেলফিটিই এখন পরিবারের সঙ্গে রুমাইসার শেষ স্মৃতি হয়ে আছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল মনের এই শিশুটি অসুস্থতার সময় বমি করার পর গৃহকর্মীর সামনে কাপড় পাল্টাতেও লজ্জা পেয়েছিল বলে জানান তার বাবা।
চিকিৎসক মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, দেশের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পিআইসিইউ থাকলে, সরকারি চিকিৎসাসেবা উন্নত হলে এবং ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতেই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ থাকলে হয়তো পরিস্থিতি এমন হতো না। তিনি জানান, বনশ্রীতে তাদের বাসার পাশেই একটি ময়লার ভাগাড় রয়েছে যেখানে নিয়মিত পানি জমে থাকে, কিন্তু তা দেখার কেউ নেই। বার্ন ইনস্টিটিউটে কাজের অভিজ্ঞতায় পোড়া শিশুদের কষ্ট দেখে ওমর ফারুক সব সময় মেয়েকে রান্নাঘর থেকে দূরে রাখতেন, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছোট্ট একটি মশার কামড়েই তার আদরের সন্তানকে চিরতরে হারিয়ে ফেলতে হলো।

























