উল্লাসের বুলডোজার এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় আতঙ্ক
- আপডেট সময় : ০৯:৩১:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই উত্তাল সময়ে রাজধানী ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আওয়ামী লীগের অফিস ও পলাতক নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় অনেকের মধ্যে উল্লাস দেখা গিয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষোভের বশে চালানো সেই ভাঙচুরের উৎসবে যারা হাততালি দিয়েছিলেন, তারা তখন হয়তো ভাবেননি যে এই ‘বুলডোজার ভূত’ একদিন সাধারণ মানুষের জীবনেও ভয়াবহ আতঙ্ক হয়ে দেখা দেবে।
সেই ভারী যান, যা শুরুতে প্রতিপক্ষের ওপর ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম ছিল, তা এখন দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের সম্পদ দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর সর্বশেষ ও ভয়াবহ উদাহরণ মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার দখলচেষ্টা। গত সপ্তাহে রাতের আঁধারে ভারী যন্ত্রপাতি ও বুলডোজার ব্যবহার করে অর্ধশত বছরের পুরনো এই সেবামূলক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবন পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় হাসপাতালটির প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ—যার মধ্যে আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, টিকাদানের সামগ্রী, জেনারেটর, এসি, ফ্রিজ ও ওষুধপত্র ছিল—তা লুটপাট করা হয়। দখলদাররা সেখানে সমমনা দোকানদার সমিতির নামে সাইনবোর্ডও ঝুলিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা শুরু থেকেই সতর্ক করেছিলেন যে, বিচারবহির্ভূত উপায়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই উন্মাদনা সমাজে অরাজকতার বীজ বপন করছে। সমাজ যখন আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে বলপ্রয়োগ বা মব জাস্টিসকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেয়, তখন অপরাধী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে।
মিরপুরের এই ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ দলের দখলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পুলিশ এখন পর্যন্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে তার পদ হারাতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে এই প্রতিশোধপরায়ণতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম না মেনে ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেওয়া রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল কুলি বা দিনমজুর গোছের লোকজনকে গ্রেপ্তার করে এই সংস্কৃতি বন্ধ হবে না। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মূল ইন্ধনদাতাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, এই বেআইনি হামলা ও দখলদারির ভয়ে জনকল্যাণমূলক খাতে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, ভূমিদস্যু ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সরকারের এই কঠোর অবস্থান চলমান রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ সাধারণ মানুষের ওপর বুলডোজার চালানোর দুঃসাহস না দেখায়।



























