যৌথ তালিকার চেয়ে অনেক বেশি বাংলাদেশ-ভারতের অভিন্ন নদী
- আপডেট সময় : ০৮:১০:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আন্তসীমান্ত নদীর সরকারি তালিকা ও বাস্তবের সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে। যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট আন্তসীমান্ত নদী ৫৭টি, যার মধ্যে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদী ৫৪টি এবং বাকি ৩টি মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত। তবে নদী গবেষক ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদীর সংখ্যা বাস্তবে আরও অনেক বেশি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো সঠিক বা নিশ্চিত পরিসংখ্যান তৈরি করতে পারেনি কোনো পক্ষই।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি তালিকার বাইরে অসংখ্য নদী দুই দেশের সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রচলিত তালিকায় রংপুর বিভাগ দিয়ে ১৮টি অভিন্ন নদী প্রবাহিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই একটি বিভাগেই অন্তত ৬৩টি আন্তসীমান্ত নদীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলির মতো নদীগুলো বাস্তবে সচল থাকলেও সরকারি তালিকায় এদের কোনো নাম নেই। এমনকি দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী নদীর উৎস নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। ভারত থেকে খেড়ুয়া ও পাঙ্ঘা নামের দুটি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে মিলিতভাবে দেওনাই নাম ধারণ করলেও মূল নদী দুটির নাম তালিকায় অনুপস্থিত। রংপুর বিভাগেই সরকারি স্বীকৃতির বাইরে রয়ে গেছে অন্তত ৪৬টি নদী, যার মধ্যে ১০টি নদীর নাম জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকাতেও নেই।
সারাদেশে আন্তসীমান্ত নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন হিসাব রয়েছে। ইতিহাস ও নদী-গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী এখন পর্যন্ত ২২৩টি অভিন্ন নদীর সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের নদনদী’ বইয়ে নদী-গবেষক ম ইনামুল হক ১৬৭টি আন্তসীমান্ত নদীর কথা উল্লেখ করেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও ১৬টি নদীকে আন্তসীমান্ত নদী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব ভারতের কাছে পাঠালেও ভারত তা আমলে নেয়নি বলে জানান নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন।
সাধারণত ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা নদীগুলোকেই তালিকায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতে গেছে, এমন নদীও রয়েছে অনেক। প্রচলিত তালিকায় কেবল কুলিক নদের ক্ষেত্রে এমনটি উল্লেখ থাকলেও রংপুর বিভাগেই এ ধরনের আরও ১১টি নদীর সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে রয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের কাহালাই, জলই ও টাঙন; দিনাজপুরের তেঁতুলিয়া, নোনা, ভেলামতী ও ছোট যমুনা; পঞ্চগড়ের বেরং ও ডাহুক এবং লালমনিরহাটের চেনাকাটা ও খর্প।
can সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের তালিকাতেও রয়েছে চরম সমন্বয়হীনতা। ২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের নদ-নদী: সংজ্ঞা ও সংখ্যা’ বইয়ে আন্তসীমান্ত নদীর সংখ্যা ৬৮টি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে জেআরসি স্বীকৃত ৫৪টি নদীর মধ্যে ৪৪টি স্থান পেলেও বাকি ১০টিকে আন্তসীমান্ত বলা হয়নি। আবার ২০২৫ সালে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ১ হাজার ৪১৫টি নদীর তালিকায় ১২৬টিকে বাংলাদেশ-ভারত আন্তসীমান্ত নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকায় জেআরসির প্রচলিত ৫৪টি নদীর মধ্যে ৪৩টি থাকলেও বাদ পড়েছে ১১টি। তবে জেআরসির তালিকার বাইরে আরও ৮৩টি নদীকে এখানে আন্তসীমান্ত নদী হিসেবে দেখানো হয়েছে।
দেশ স্বাধীনের এত বছর পরও অভিন্ন নদীর সঠিক সংখ্যা চিহ্নিত না করতে পারাকে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারত উজানের দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য এই হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুড়িগ্রামের কালজানি, গদাধর ও গঙ্গাধরের মতো বড় নদীগুলো জেআরসির তালিকায় না থাকায় ভারত চাইলে এসব নদীর পানি ইচ্ছামতো প্রত্যাহার করতে পারে এবং তালিকায় না থাকার অজুহাত দিতে পারে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, সব আন্তসীমান্ত নদীরই যৌথ নদী কমিশনের স্বীকৃতি থাকা জরুরি। এ বিষয়ে নদীকর্মীদেরও জোরালো দাবি তোলা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত এলাকার প্রতিটি মৌজা সরেজমিন পরিদর্শন করে এবং সিএস, এসএ ও বিএস রেকর্ড পর্যালোচনা করে সহজেই একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি করা সম্ভব। ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের সাবেক অনারারি সদস্য ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, অতীতে ৫৪টি নদী নির্ধারণের সময় মাঠপর্যায়ে যথাযথ পরিদর্শন করা হয়নি। সরকারি অবহেলার কারণেই সব আন্তসীমান্ত নদীকে যৌথ তালিকায় আনা সম্ভব হয়নি। তবে দেশের স্বার্থে প্রতিটি নদীর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
মূলত ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরই এ কাজ করা প্রয়োজন ছিল।
পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কমিশনের অনারারি সদস্য ছিলেন।



























