দেশে বাড়ছে দক্ষ কর্মীর চাহিদা, অথচ ৫ বছর ধরে শিক্ষার্থীহীন ৬২১ প্রতিষ্ঠান
- আপডেট সময় : ০৯:২১:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সময়ে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বায়োটেকনোলজি ও আধুনিক উৎপাদন খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তবে এই বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বাংলাদেশ। দেশের বিশাল এক তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও তাদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার গতি অত্যন্ত মন্থর। বর্তমানে দেশের মোট শ্রমশক্তির মাত্র ১৫ শতাংশের কিছু বেশি অংশ আনুষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ পেয়েছে। ফলে দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, কেবল বড় বড় কথা বা বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিলেই কেবল মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি সম্ভব।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখনো বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং চামড়া, জাহাজ নির্মাণ, আইসিটি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো খাতগুলো দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেলেও তাদের একটি বড় অংশই অদক্ষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিদেশগামীদের যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো যেত, তবে দেশের রেমিট্যান্স আয় বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব হতো। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। যেমন জার্মানির 'ডুয়াল সিস্টেমে' শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে কয়েকদিন ভোকেশনাল স্কুলে এবং বাকি সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি হাতে-কলমে কাজ শেখে। এটি সরকার, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের যৌথ পরিচালনায় চলে। ফিনল্যান্ডেও সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষাকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয় এবং সেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে। সিঙ্গাপুরে শিল্পের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে কারিগরি কোর্স চালানো হয় এবং দক্ষিণ কোরিয়াতেও সরকার ও শিল্পগোষ্ঠীর অংশীদারত্বে কারিগরি কলেজ গড়ে তুলে দ্রুত শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তর সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মূলত সাধারণ ও সনদনির্ভর রয়ে গেছে। এর ফলে একদিকে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাতে দক্ষ কর্মীর তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোকেশনাল শিক্ষা পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া ৩,৪৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না এবং এগুলোর কার্যক্রম কার্যত বন্ধ। এর মধ্যে ৪৪৩টি এসএসসি ভোকেশনাল এবং ১৭৮টি দাখিল ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর এসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, আবার কোথাও আধুনিক ল্যাব ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে এসব প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাস্তবে দক্ষতা অর্জনের কোনো সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতি উত্তরণে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আব্দুর রাহিম সাকি জানিয়েছেন, বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রথমে সক্রিয় করা জরুরি। ৩২৯টি উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগের অংশ হিসেবে বর্তমানে ২৬৮টি উপজেলায় এই কেন্দ্র চালু রয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালুর আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। এছাড়া, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়নে বাংলাদেশকে ১৫ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এই কর্মসূচির আওতায় মেকানিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল, তথ্যপ্রযুক্তি, সিভিল এবং খাদ্য ও কৃষি—এই পাঁচটি প্রযুক্তি ক্লাস্টারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে অন্তত ১০ হাজার টিভিইটি শিক্ষকের দক্ষতা বাড়ানো হবে, যা আড়াই লাখের বেশি শিক্ষার্থীর ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ প্রসঙ্গে বলেন, কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক করতে চীনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চীনের মতো বাংলাদেশেও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদেশি মডেল হুবহু কপি না করে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে তা প্রয়োগ করতে হবে। প্রথমত দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন, শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম এবং শিল্পভিত্তিক ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ করতে বৃত্তি, চাকরির নিশ্চয়তা, উদ্যোক্তা তহবিল এবং নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান দেশের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিদ্যালয় পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে বেসিক ট্রেড, ডিজিটাল লিটারেসি ও উদ্যোক্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া জার্মানির মতো প্রতিটি পলিটেকনিকের সঙ্গে নিকটবর্তী শিল্প এলাকার চুক্তি ও শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত করা দরকার। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ উপযোগী ল্যাব, থ্রিডি প্রিন্টার, সিএনসি মেশিন ও সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে। শিক্ষকদের মানোন্নয়নে শিল্প থেকে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে আনা এবং শিক্ষকদের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি এনএসডিএর মাধ্যমে প্রতি দুই বছর পরপর পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং নারীদের অংশগ্রহণে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করা দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দেশ স্বাধীনের ৫৫ বছর পর ২০২৬ সালে এসে আমাদের এখনো সাক্ষরতা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে, অথচ এই সময়ে আমাদের বৈজ্ঞানিক, ডিজিটাল কিংবা আর্টিফিশিয়াল লিটারেসি নিয়ে কথা বলার কথা ছিল। আমরা এখনো বহুদূর পিছিয়ে আছি। একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়ে শিক্ষা অধিকার সংসদের সদস্য সচিব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক এবং যথাযথ পাঠদান ছাড়া দক্ষ জনশক্তি তৈরি বা বেকারত্ব দূর করার পরিকল্পনা অবাস্তব। এ সমস্যা সমাধানে তিনি একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ৪৬আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ০৬




























