যুক্তরাষ্ট্র-চীনের এআই যুদ্ধ: প্রযুক্তিগত ঝুঁকি ও কূটনীতির নতুন সমীকরণ
- আপডেট সময় : ১১:২৯:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতি এক জটিল মোড় নিয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট যখন চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হি লিফেংয়ের সঙ্গে এআই সংক্রান্ত আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগগুলোকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম চায়না ডেইলি অভিযোগ তুলেছে যে, চীনের এআই অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতেই মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো এ প্রযুক্তির গতি কমিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, কোনো দেশই এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকতে চায় না, আবার একে অপরকে বিশ্বাসও করে না। এআই প্রযুক্তি কূটনীতির চূড়ান্ত অগ্রগতির জন্য অপেক্ষা করবে না, তবে ট্রাম্প ও সি চিন পিং এআই নিয়ে আলোচনার আহ্বান পুরোপুরি উপেক্ষা করবেন না বলেই মনে হচ্ছে।
মার্কিন-চীন কূটনীতির ক্ষেত্রে দুটি চিরাচরিত ফাঁদ এড়িয়ে চলা জরুরি। প্রথমত, লক্ষ্যমাত্রা এত কম নির্ধারণ করা যাবে না যেন সংলাপটি কেবল সৌজন্যমূলক ছবি তোলা বা সাধারণ আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয়ত, এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য রাখা যাবে না যা রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাস্তবায়ন অসম্ভব। এর পরিবর্তে, স্বল্পমেয়াদী ও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে এআই নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত বিনিময়কে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। উভয় দেশেরই উচিত তাদের এআই মডেলের বিপজ্জনক সক্ষমতা—যেমন অপেশাদার কাউকে জৈব অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করা বা মানুষের নজরদারি এড়ানোর দক্ষতা—পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা। মার্কিন এআই কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর ধরে এসব ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করছে এবং চীনও তাদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় নীতিতে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেছে।
এই প্রযুক্তিগত বিনিময়ের জন্য পরাশক্তি দুটির মধ্যে গভীর বিশ্বাস বা এআই-সংক্রান্ত ঝুঁকিতে একমত হওয়ার প্রয়োজন নেই; এটি চালিত হবে সম্পূর্ণ নিজস্ব স্বার্থের কারণে। সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলগুলো যত শক্তিশালী হয়ে উঠবে, দুটি দেশের জন্যই সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা তত জরুরি হয়ে পড়বে। এই কূটনীতি কোনো ঢালাও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মতো নয়; বরং এটি এমন একটি প্রযুক্তির জন্য নিরাপত্তাবিধি ও কার্যপ্রণালি তৈরি করা, যা কোনো সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই।
এই দৃষ্টিভঙ্গি সফল করতে হলে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সরাসরি একটি সংকট-যোগাযোগ প্রটোকল থাকতে হবে। ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো এআই মডেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কোনো চীনা নেটওয়ার্কে সাইবার হামলা চালাল, অথবা চীনের একটি এআই-চালিত ড্রোন কোনো মার্কিন নৌযানে আঘাত করল—এমন পরিস্থিতিতে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে লিখিত বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। মৌখিকভাবে না জানিয়ে লিখিত বার্তা পাঠানোর ফলে চীনের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো সেটি বিশ্লেষণ করে একটি সুচিন্তিত জবাব দেওয়ার সময় পাবে, যা তাৎক্ষণিক ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনার ঝুঁকি কমাবে।
প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যান্য বিষয় বা শর্ত ছাড়াই এ-সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হওয়া উচিত। বেইজিং যদি উন্নত চিপ এবং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের শর্ত জুড়ে দেয়, তবে ওয়াশিংটনকে স্পষ্টভাবেই বিষয় দুটি আলাদা রাখতে হবে। এআই নিরাপত্তা কূটনীতির মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে বন্ধুতে পরিণত করা নয়, বরং তাদের প্রতিযোগিতার পরিণতি যেন এমন কোনো বিপর্যয়ে না গড়ায় যা কোনো পক্ষই চায় না। যদিও বর্তমানে একটি সুদূরপ্রসারী চুক্তিতে পৌঁছানোর মতো রাজনৈতিক পরিবেশ নেই, তবুও ছোট একটি উদ্যোগ থেকেও টেকসই ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে উভয় দেশই হয়তো বুঝতে পারবে, এআইয়ের দৌড়ে কে জিতবে তা নিয়ে একমত না হলেও, প্রযুক্তি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়—সে বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।





























