বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা
- আপডেট সময় : ০২:১৩:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

বিদ্যুৎ সংকট বর্তমানে নাগরিক ও গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্থবির করে দিচ্ছে। এই এককেন্দ্রিক জ্বালানি নির্ভরতা থেকে মুক্তির কার্যকর উপায় হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ। বাংলাদেশ একটি অফুরন্ত সৌরশক্তির দেশ, যেখানে রোদ, আলো, বাতাস ও পানির মতো উপাদানগুলো প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। ঘন ঘন লোডশেডিং থেকে মুক্তি পেতে এবং উৎপাদন সচল রাখতে দেশীয় প্রযুক্তির প্রসার ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশে সৌরশক্তির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। শুধুমাত্র কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পরিকল্পিতভাবে সৌরশক্তি সংগ্রহ করা গেলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অর্ধেক মেটানো সম্ভব। এছাড়া বাসাবাড়ির ছাদ, রেলওয়ের শেড, স্কুল-কলেজ এবং সরকারি বিভিন্ন ভবনের ছাদ হতে পারে সৌরবিদ্যুতের বড় উৎস। হাওর ও চরাঞ্চলের বিশাল খোলা প্রান্তরকেও সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রতিটি স্টেশনের অব্যবহৃত শেডগুলোতে সোলার প্যানেল বসালে স্থানীয় বিদ্যুতের চাহিদা সহজেই মেটানো সম্ভব, যা জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাবে।
দেশের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে নিজস্ব ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। যেমন, একটি জেলা শহরের সরকারি স্কুলে ২০ কিলোওয়াটের সোলার সিস্টেম স্থাপনের পর তাদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। এই বিদ্যুৎ দিয়ে ক্লাসরুমের ফ্যান, লাইট ও কম্পিউটার ল্যাব চালানো হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, ইলেকট্রনিকস এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক 'রুফ টপ গ্রিড কানেক্টেড সোলার ফটোভোল্টেইক সিস্টেম' নামে একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যা সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পারে। এই ১.১ কিলোওয়াট ক্ষমতার সিস্টেমটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপান্তরিত শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, দেশের মোট আয়তনের মাত্র ১ শতাংশ জায়গা ব্যবহার করে ৪০,০০০ (40,000) মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ এবং বায়ুশক্তি ব্যবহার করে আরও ২,০০০ (2,000) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
শিল্প-কারখানার অব্যবহৃত ছাদগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্প, কারণ ভূমিতে ১ মেগাওয়াট সোলার প্যানেল বসাতে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন একর জমির প্রয়োজন হয়। গাজীপুরের একটি তৈরি পোশাক কারখানা তাদের ছাদে ১ মেগাওয়াটের সোলার প্যানেল স্থাপন করে দারুণ সাফল্য পেয়েছে। এর ফলে দিনের বেলা তাদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সোলার থেকে আসছে, জেনারেটরে ডিজেলের ব্যবহার কমেছে ৬০ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিলও অনেক হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে 'গ্রিন ফ্যাক্টরি' হিসেবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে এবং মাত্র তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে তারা বিনিয়োগের টাকা তুলে নিতে সক্ষম হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে বিকল্প শক্তি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। ভারতের মধ্যপ্রদেশের সাঁচি শহরটি ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুতে চালিত দেশের প্রথম 'সোলার সিটি' হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। ২০ লাখ ইউরো ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের ফলে বছরে প্রায় ১৪,০০০ (14,000) টন কার্বন নির্গমন কমানো সম্ভব হচ্ছে। প্রায় ৮,০০০ (8,000) জনসংখ্যার এই শহরের সব সরকারি ভবনের ছাদে এখন সৌর প্যানেল বসানো আছে। এছাড়া ভারতের বিক্রম সোলার বিশ্বজুড়ে ১০ গিগাওয়াট সোলার মডিউল স্থাপনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে, যা প্রায় ৫০ লাখের বেশি ভারতীয় বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম। তারা মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ৫ গিগাওয়াট থেকে ১০ গিগাওয়াটে উন্নীত করেছে। ভারতে ১ কোটি সৌর বাল্ব ব্যবহারের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৫০ কোটি লিটার কেরোসিন তেল এবং সরকারের ২,০০০ (2,000) কোটি রুপি ভর্তুকি বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে। দেশটির মোট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ইতিমধ্যে ১৫০ গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
ভিয়েতনামে ২০২০ সালে মাত্র এক বছরের মধ্যে ১১,০০০ (11,000) মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা হয়, যার ৪৮ শতাংশ ছিল রুফটপ সোলার। ২০১৮ সালে ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা শূন্যের কোঠায় থাকলেও ২০২০ সালের শেষে তা ১৬,৫০০ (16,500) মেগাওয়াটে উন্নীত হয়, যা তাদের মোট সক্ষমতার ২৫ শতাংশ। নেপালে গ্রামীণ এলাকায় ঘরবাড়ি দূরে দূরে হওয়ায় সরকার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়। সেখানে ৬০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে এবং বাকি ৪০ শতাংশের অর্ধেক জীবাশ্ম জ্বালানি ও অর্ধেক সৌর বা জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করে। জার্মানিতে প্রাকৃতিক উপাদানের প্রাচুর্য কম থাকা সত্ত্বেও ২০৪০ সালের মধ্যে পুরো দেশকে সৌরশক্তিতে চালানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের বেইজিং ও সাংহাইয়ের ছাদে শীতকালে ওয়াটার হিটার হিসেবে সোলার প্যানেল ব্যবহৃত হয় এবং মঙ্গোলিয়ার ওরডোস সিটিতে আমেরিকার ম্যানহাটনের চেয়েও বড় সোলার ফিল্ড তৈরি করা হচ্ছে, যা ৩০ লাখ বাড়িতে বিদ্যুৎ দেবে। এমনকি আমেরিকার হোয়াইট হাউসের আবাসিক এলাকাতেও সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে প্রেসিডেন্ট ওবামার পরিবারের জন্য পানি গরম করার উদ্দেশ্যে।
বাংলাদেশ সরকারের নীতিমালায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি গ্রামাঞ্চল ও উপশহরে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং এই সংশ্লিষ্ট আমদানিতে শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন ব্যাংকের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে বছরে ৩০০ দিনেরও বেশি সময় পর্যাপ্ত রোদ থাকে এবং দৈনিক গড়ে ৬-৮ (6-8) ঘণ্টা সূর্যালোক থেকে প্রতি বর্গমিটারে ৪.৫-৫.৫ (4.5-5.5) কিলোওয়াট ঘণ্টা শক্তি পাওয়া যায়। ১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে ১,৫০০ (1,500) টন কার্বন নিঃসরণ রোধ করে এবং এতে গড়ে ৫৫ জনের কর্মসংস্থান হয়। দেশের জমির সীমাবদ্ধতা কাটাতে জলাশয়ের ওপর ভাসমান সৌর প্রকল্প, মহাসড়কের পাশে সোলার স্থাপন এবং সরকারি ভবনে বাধ্যতামুলক সৌর প্যানেল ব্যবহারের মতো সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।





























