দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জনের আত্মহত্যা, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
- আপডেট সময় : ১২:১৫:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রবণতা দিন দিন এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের জীবনাবসান ঘটাচ্ছেন, যার বড় একটি অংশই তরুণ ও শিক্ষার্থী। সম্প্রতি পুলিশের পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা বাড়ায় সমাজ ও পরিবারের সচেতনতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে মোট ৭৬ হাজার ৩৬১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ নিজেদের জীবন শেষ করে দিচ্ছেন। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের অনুমিত হিসাবে দেশে বছরে ৪ হাজার ৭১৪ জনের আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছিল, যা পুলিশের প্রকৃত রেকর্ডের তুলনায় তিন গুণেরও কম। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দেশে আত্মহত্যার প্রকৃত চিত্রটি আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ। অনেক সময় সামাজিক লোকলজ্জা বা আইনি জটিলতা এড়াতে পরিবার থেকেও আত্মহত্যার ঘটনা লুকিয়ে রাখা হয়, ফলে অনেক তথ্য আড়ালেই থেকে যায়।
তরুণ ও শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চিত্র বিশ্লেষণ করে সামাজিক সংগঠন 'আঁচল ফাউন্ডেশন' জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৩১০। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে স্কুলপর্যায়ে—১৯০ জন বা ৪৭.৪০ শতাংশ। এছাড়া কলেজে ৯২ জন (২২.৮%), বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন (১৯.১০%) এবং মাদ্রাসায় ৪৪ জন (১০.৭২%) শিক্ষার্থী নিজেদের জীবন শেষ করেছে। এর আগে ২০২১ সালে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ২০২২ সালে ৫৩২ জন শিক্ষার্থী এবং ২০২৩ সালে ৫১৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল। তাছাড়া, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীদের তুলনায় পুরুষ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার (৫৯%) বেশি দেখা গেছে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের অন্য এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া ২০২১ ও ২০২২ সালে কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রুয়েটেরই ১১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। ২০২২ সালে সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৮৬ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পড়াশোনার চাপ, আর্থিক সংকট, বেকারত্ব এবং কাঙ্ক্ষিত জিনিস (যেমন মোবাইল বা মোটরসাইকেল) না পাওয়ার মতো তুচ্ছ কারণেও অনেকে এই চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এছাড়া ইদানীং এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা, মাদকাসক্তি, পরকীয়া ও বিবাহবিচ্ছেদের মতো সামাজিক অস্থিরতাও মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আত্মহত্যা কোনো সংক্রামক রোগ না হলেও এটি এখন মহামারির চেয়েও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমান প্রগতির যুগে তরুণদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ছে সত্য, কিন্তু আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না। এই সংকট মোকাবিলায় সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকে। অথচ অনেক অভিভাবক এখনও প্রাচীন ধ্যান-ধারণা নিয়ে চলেন এবং নতুন প্রজন্মের মানসিকতার সাথে তাল মেলাতে পারেন না। মানসিক শক্তি বৃদ্ধি, নিয়মিত মেডিটেশন এবং জীবনকে ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রবণতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি, উচ্চশিক্ষা শেষ করে তরুণরা যাতে হতাশায় না ভোগে, সেজন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রেরও বড় ধরনের দায়িত্ব রয়েছে।





























