১৫ মাসের শিশুসহ কারাবাস খাটলেন ফাতেমা, পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
- আপডেট সময় : ১২:৫৮:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যার মামলার বাদী ফাতেমা বেগমকে তাঁর ১৫ মাস বয়সী শিশুসন্তানসহ সাত দিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। তবে যে পাল্টা মামলার জেরে তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছিল, সেটির পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে যেসব সাক্ষীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের কয়েকজন দাবি করেছেন যে তাঁরা কোনো সাক্ষ্যই দেননি।
নিহত মুহাম্মদ কাশেম পেশায় একজন জেলে ছিলেন। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মহেশখালীর কুতুবজোমের কবির বাজার এলাকায় তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পরদিন তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বেগম ১০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্যতম আসামি মো. রাসেল। স্বামী হত্যার পর ফাতেমাকে ক্রমাগত ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ২০২৫ সালের ৬ মে মহেশখালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন তিনি।
এদিকে, কাশেম হত্যা মামলার আসামি রাসেলের মা নুর জাহান বেগম ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট আদালতে একটি পাল্টা নালিশি দরখাস্ত করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ওই বছরের ২৪ মে ফাতেমা বেগম, তাঁর মা, তিন ভাই, মামা ও ছোট বোনসহ সাতজন মিলে তাঁদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছেন। আদালত অভিযোগটি তদন্তের জন্য মহেশখালী থানাকে নির্দেশ দেন। থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহেরুল ইসলাম তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার দাবি করা হয়।
তবে এই তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের নাম উল্লেখ করা হলেও তাঁরা জানিয়েছেন, এ মামলায় তাঁরা কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি তাঁদের নাম কীভাবে প্রতিবেদনে এল, তা-ও তাঁরা জানেন না। তাঁদের দাবি, ২০২৫ সালের ২৪ মে এলাকায় কোনো ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনাই ঘটেনি। মূলত ২৩ এপ্রিল কাশেম হত্যার দিন উত্তেজিত জনতা রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছিল, যার সঙ্গে কাশেমের পরিবারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম, মমতাজ বেগম এবং কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল ও ইউপি সদস্য মাহমুদুল হকও একই দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, ২৪ মে কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। কাশেমের পরিবারকে চাপে রাখতেই এই পাল্টা মামলা সাজানো হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান শেখ কামাল জানান, নিহত কাশেম ও আসামি রাসেল সম্পর্কে আত্মীয় এবং সামান্য টাকার বিরোধ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
এ বিষয়ে মামলার বাদী নুর জাহান বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে এলাকায় পাওয়া যায়নি এবং তাঁর মুঠোফোনটিও বন্ধ ছিল। অন্যদিকে, তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তবে ঘটনাটি এক বছর আগের হওয়ায় বর্তমানে মাতারবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত এই কর্মকর্তা বিস্তারিত নথিপত্র না দেখে বলতে অপারগতা জানান। মহেশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রতুল কুমার শীল জানান, বিষয়টি জেনে তিনি পরে বিস্তারিত জানাবেন এবং সাক্ষীদের জবানবন্দিতে কোনো অসঙ্গতি থাকলে আদালত ব্যবস্থা নেবেন।
এর আগে, গত ৩১ আগস্ট রাতে পুলিশ ফাতেমা বেগম, তাঁর শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং নাছিমা আকতার নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন আদালত রাশেদা ও নাছিমাকে জামিন দিলেও ফাতেমাকে ১৫ মাসের শিশুসহ কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মা কারাগারে থাকায় ফাতেমার অন্য দুই মেয়ে—চতুর্থ শ্রেণীর রাজমিন আকতার ও প্রথম শ্রেণীর মিশকাত জান্নাতকে কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা সুমাইয়া (রা.) এতিমখানায় আশ্রয় নিতে হয়। অবশেষে গতকাল সোমবার দুপুরে মহেশখালীর সিনিয়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইনের আদালত এক হাজার টাকার বন্ডে ফাতেমার জামিন মঞ্জুর করেন। জামিন পেলেও আসামিদের স্বজনদের কাছ থেকে এখনো হুমকি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ফাতেমার শাশুড়ি রাশেদা বেগম।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হক জানান, ফাতেমার ছোট তিন কক্ষের একটি মাটির দেয়াল ও টিনের চালের ঘর রয়েছে। স্বামীকে হারানোর পর শাশুড়ি ও তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি সেখানেই থাকতেন। মা কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর দুই মেয়েকে এতিমখানায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন, বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।তবে প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে থাকা নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।



























