হাসপাতালে অসুস্থ ব্যক্তির দলিলে সই: আইনি গুরুত্ব ও প্রক্রিয়া কী
- আপডেট সময় : ০৩:১২:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

৩ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দাবি করা হয়, বৃদ্ধের সামনে থাকা নারী তাঁর মেয়ে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা এক বৃদ্ধের কাছ থেকে তাঁর মেয়ে জোর করে জমির দলিলে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই ঘটনাটি জনমনে নৈতিকতার প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি আইনি কৌতূহলও তৈরি করেছে। মূলত, অসুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে দলিলে সই নিলেই জমির মালিকানা বদলে যায় না; এর জন্য রেজিস্ট্রেশন আইনের সুনির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী, জমি যেখানে অবস্থিত, সাধারণত সেই উপজেলার সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়েই দলিল উপস্থাপন করতে হয়। আইন অনুযায়ী, দলিল সম্পাদনের সময় দাতা বা বিক্রেতাকে অবশ্যই নিবন্ধন কর্মকর্তার সামনে উপস্থিত থাকতে হবে। তবে জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে শুধু সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এবং স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯-সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনও প্রয়োগ হয়। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩৪ ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধন কর্মকর্তা দলিলদাতাকে শনাক্ত করবেন এবং তিনি নিজের ইচ্ছায় দলিলটি সম্পাদন করেছেন কি না, তা যাচাই করবেন। শুধু দলিলে সই করাই মালিকানা পরিবর্তনের শেষ ধাপ নয়; বরং দলিলটি নিবন্ধিত না হওয়া পর্যন্ত আইনত কোনো নতুন মালিকের অধিকার সৃষ্টি হয় না।
রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ ও ৪৯ ধারা অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। কোনো দলিল নিবন্ধিত না হলে সেটি জমির মালিকানা হস্তান্তর বা সীমিত করার আইনি ক্ষমতা রাখে না। সাধারণ বিক্রয় দলিলের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি দলিল মূল্যের ১ শতাংশ এবং স্ট্যাম্প শুল্ক ১ দশমিক ৫ শতাংশ, যার সঙ্গে স্থানীয় সরকার কর ও উৎসে কর যুক্ত হয়। তবে ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধানে জমির অবস্থান ও শ্রেণিভেদে উৎসে করের হার ভিন্ন হতে পারে।
অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য রেজিস্ট্রেশন আইনে বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থতার কারণে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হতে না পারেন, তবে আইনের ৩৮ ধারা অনুযায়ী 'কমিশন' প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা যায়। এই প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্রি অফিসের একজন কর্মকর্তা হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাবরেজিস্ট্রার ও ভূমি রেজিস্ট্রেশন বিশেষজ্ঞ মো. শাহাজাহান আলী জানান, রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছাড়া কোনোভাবেই দলিল নিবন্ধন সম্ভব নয়। পরিবারের সদস্য বা অন্য কেউ নিজে দলিল নিয়ে সই করিয়ে আনলেই সেটি বৈধ দলিল হিসেবে গণ্য হয় না।
জমি নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় দাতার স্বাক্ষরের পাশাপাশি আঙুলের ছাপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিক্রেতা বা দাতার পরিচয় নিশ্চিত করা এবং তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই একটি বৈধ দলিল নিবন্ধনের মূল শর্ত। তাই হাসপাতালের বিছানায় সই নেওয়াকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার আইনি সমাধান কেবল যথাযথ কমিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্ভব।

























