ঢাকা ০৩:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সৌদি আরবে হুতি হামলা: শাহজালালে ১০০ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে ১৫৩৯৩ যাত্রী রাজধানীতে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, আহত চালক শাহরাস্তিতে স্কুল ফাঁকি দিয়ে ঘোরাফেরা করায় ১৬ শিক্ষার্থী আটক ভোলায় নদীভাঙন রোধে ৬০৫ কোটি টাকার প্রকল্প, এলাকাবাসীর আনন্দ দশমিনায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে মা ইলিশ নিধন হরমুজ প্রণালিতে সিঙ্গাপুরের দুটি জাহাজে হামলা, একটি ডুবেছে ভারতকে হারিয়ে সিরিজে সমতা ফেরাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সাজেক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা: ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন জাজিরায় জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়ম ও পোকা পাওয়ার অভিযোগ বাজারে বিক্রি হওয়া সব সয়াবিন তেল বিশুদ্ধ: শিল্পমন্ত্রী

নেপালের অবকাঠামো ধ্বংস কেন বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে?

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৮:০৯:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



২৬ আগস্ট সকালে উত্তর রাসুয়ার ভোতেকোশী নদীতে প্রায় ১০ মিটার উঁচু পানির ঢল আছড়ে পড়ে। তিমুরে ও সিয়াব্রুবেসি এলাকায় আঘাত হানা এই আকস্মিক বন্যায় বহু বসতি ধ্বংস হয়েছে, কাস্টমসের অবকাঠামো ভেসে গেছে এবং পুলিশ ফাঁড়ি ভেঙে পড়েছে। এছাড়া জলবিদ্যুৎ স্থাপনা ও দেশের প্রধান বাণিজ্যপথের ওপর নির্মিত নতুন সেতুগুলোও এই বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঠমান্ডুর সরকারি প্রতিবেদনে একে হয়তো ‘নজিরবিহীন জলবিদ্যাগত ঢল’ হিসেবে অভিহিত করা হবে, কিন্তু এক দশকের ব্যবধানে একই এলাকায় বারবার এমন ঘটনা ঘটার অর্থ হলো, একে আর আকস্মিক বলা চলে না। এটি মূলত দুর্বল পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদর্শিতার অভাবের প্রতিফলন।

নেপালের বর্তমান উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কৌশলগত নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সড়ক সম্প্রসারণের নকশা—সব ক্ষেত্রেই গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত, গড় তাপমাত্রা এবং নদীর গড় পানিপ্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। গড় হিসাব ব্যবহারের ফলে কাগজে-কলমে প্রকল্পগুলো সহজ মনে হলেও, নেপালের অস্থির পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এই গড় মান মেনে চলে না। হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রভাব হলো আবহাওয়ার চরম ভাব বৃদ্ধি পাওয়া। যখন কয়েক মাসের সমপরিমাণ পানি কয়েক মিনিটের মধ্যে সরু গিরিখাতে নেমে আসে, তখন নদীর স্বাভাবিক রূপ পুরোপুরি বদলে যায়।

প্রচলিত প্রকৌশল পদ্ধতিতে ৩০ বছরের গড় বন্যার উচ্চতা বা বর্ষার গড় পানিপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে অবকাঠামোর নকশা করা হয়। কিন্তু এই পদ্ধতি মূলত শান্ত অবস্থার কথা ভেবে তৈরি, যা চরম বা অস্বাভাবিক বিপর্যয়ের সময় টিকে থাকতে পারে না। পরিসংখ্যানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মান বিচ্যুতি’, যেখানে গড় থেকে বিচ্যুতিই আসল বিপদ ডেকে আনে। এই পরিসংখ্যানগত ভুলের কারণে একদিকে যেমন বিপুল সরকারি অর্থ নষ্ট হচ্ছে, তেমনি হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। প্রতিবছর একই জায়গায় গড় হিসাব ধরে একই সেতু নির্মাণ করা মানে একই ক্ষতি বারবার ডেকে আনা।

এই চক্র ভাঙতে হলে সরকারি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনা জরুরি। পাহাড়ি যোগাযোগপথের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শুধু গড় হিসাবের ওপর নির্ভরতা বন্ধ করতে হবে। অনুমোদনের আগে ১০০ বছরের সম্ভাব্য বৈচিত্র্যের মডেল ধরে অবকাঠামোর সক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে এবং অতীতের গড় বৃষ্টিপাতের বদলে অল্প সময়ে বিপুল পানি নামার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও তাদের প্রকল্প মূল্যায়নের পদ্ধতি বদলাতে হবে। শুধু নদীর তীর স্থিতিশীল হওয়া বা স্থানীয় অর্থনীতির সামান্য উন্নতির তথ্যই যথেষ্ট নয়; বরং বড় ধরনের দুর্যোগে সেই বিনিয়োগ কতটা টিকে থাকতে পারবে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দুর্যোগ-পরবর্তী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চেয়ে দুর্যোগের আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। অস্বাভাবিক আবহাওয়া বা উজানে বন্যার লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা ও জরুরি অর্থের ব্যবস্থা থাকলে ঝুঁকিতে থাকা মানুষ সম্পদ রক্ষার সুযোগ পাবে। বর্তমান পরিকল্পনা ব্যবস্থা এমন এক স্বাভাবিক ও মাঝারি পরিস্থিতির জন্য তৈরি, যা আর আগের মতো নেই। তাই গড় হিসাবের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চরম ও অস্বাভাবিক ঘটনার ঝুঁকি মাথায় রেখেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে হবে। যেসব ঘটনাকে আজ ব্যতিক্রমী বলা হচ্ছে, বাস্তবে সেগুলোই বারবার ঘটছে।

উদাহরণ হিসেবে যদি গড় ধরা হয় ৫০, তাহলে ৫০ এর কাছাকাছি হলো কম মান বিচ্যুতি এবং ৫০ এর বেশি হলো বেশি মান বিচ্যুতি) সহজভাবে বললে, গড় অবস্থা থেকে কোনো ঘটনা কতটা বেশি বা কম দূরে সরে যেতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।একটি সেতু বা নদীর পাশের মহাসড়ক যদি শুধু স্বাভাবিক গড় পরিস্থিতি মাথায় রেখে তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি মূলত শান্ত দিনের

গড় তথ্যের ভিত্তিতে নদীর তীর স্থিতিশীল হয়েছে বা স্থানীয় অর্থনীতি ১৫ শতাংশ বেড়েছে—এ ধরনের সাফল্য যথেষ্ট নয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

নেপালের অবকাঠামো ধ্বংস কেন বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে?

আপডেট সময় : ০৮:০৯:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

২৬ আগস্ট সকালে উত্তর রাসুয়ার ভোতেকোশী নদীতে প্রায় ১০ মিটার উঁচু পানির ঢল আছড়ে পড়ে। তিমুরে ও সিয়াব্রুবেসি এলাকায় আঘাত হানা এই আকস্মিক বন্যায় বহু বসতি ধ্বংস হয়েছে, কাস্টমসের অবকাঠামো ভেসে গেছে এবং পুলিশ ফাঁড়ি ভেঙে পড়েছে। এছাড়া জলবিদ্যুৎ স্থাপনা ও দেশের প্রধান বাণিজ্যপথের ওপর নির্মিত নতুন সেতুগুলোও এই বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঠমান্ডুর সরকারি প্রতিবেদনে একে হয়তো ‘নজিরবিহীন জলবিদ্যাগত ঢল’ হিসেবে অভিহিত করা হবে, কিন্তু এক দশকের ব্যবধানে একই এলাকায় বারবার এমন ঘটনা ঘটার অর্থ হলো, একে আর আকস্মিক বলা চলে না। এটি মূলত দুর্বল পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদর্শিতার অভাবের প্রতিফলন।

নেপালের বর্তমান উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কৌশলগত নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সড়ক সম্প্রসারণের নকশা—সব ক্ষেত্রেই গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত, গড় তাপমাত্রা এবং নদীর গড় পানিপ্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। গড় হিসাব ব্যবহারের ফলে কাগজে-কলমে প্রকল্পগুলো সহজ মনে হলেও, নেপালের অস্থির পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এই গড় মান মেনে চলে না। হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রভাব হলো আবহাওয়ার চরম ভাব বৃদ্ধি পাওয়া। যখন কয়েক মাসের সমপরিমাণ পানি কয়েক মিনিটের মধ্যে সরু গিরিখাতে নেমে আসে, তখন নদীর স্বাভাবিক রূপ পুরোপুরি বদলে যায়।

প্রচলিত প্রকৌশল পদ্ধতিতে ৩০ বছরের গড় বন্যার উচ্চতা বা বর্ষার গড় পানিপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে অবকাঠামোর নকশা করা হয়। কিন্তু এই পদ্ধতি মূলত শান্ত অবস্থার কথা ভেবে তৈরি, যা চরম বা অস্বাভাবিক বিপর্যয়ের সময় টিকে থাকতে পারে না। পরিসংখ্যানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মান বিচ্যুতি’, যেখানে গড় থেকে বিচ্যুতিই আসল বিপদ ডেকে আনে। এই পরিসংখ্যানগত ভুলের কারণে একদিকে যেমন বিপুল সরকারি অর্থ নষ্ট হচ্ছে, তেমনি হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। প্রতিবছর একই জায়গায় গড় হিসাব ধরে একই সেতু নির্মাণ করা মানে একই ক্ষতি বারবার ডেকে আনা।

এই চক্র ভাঙতে হলে সরকারি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনা জরুরি। পাহাড়ি যোগাযোগপথের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শুধু গড় হিসাবের ওপর নির্ভরতা বন্ধ করতে হবে। অনুমোদনের আগে ১০০ বছরের সম্ভাব্য বৈচিত্র্যের মডেল ধরে অবকাঠামোর সক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে এবং অতীতের গড় বৃষ্টিপাতের বদলে অল্প সময়ে বিপুল পানি নামার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও তাদের প্রকল্প মূল্যায়নের পদ্ধতি বদলাতে হবে। শুধু নদীর তীর স্থিতিশীল হওয়া বা স্থানীয় অর্থনীতির সামান্য উন্নতির তথ্যই যথেষ্ট নয়; বরং বড় ধরনের দুর্যোগে সেই বিনিয়োগ কতটা টিকে থাকতে পারবে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দুর্যোগ-পরবর্তী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চেয়ে দুর্যোগের আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। অস্বাভাবিক আবহাওয়া বা উজানে বন্যার লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা ও জরুরি অর্থের ব্যবস্থা থাকলে ঝুঁকিতে থাকা মানুষ সম্পদ রক্ষার সুযোগ পাবে। বর্তমান পরিকল্পনা ব্যবস্থা এমন এক স্বাভাবিক ও মাঝারি পরিস্থিতির জন্য তৈরি, যা আর আগের মতো নেই। তাই গড় হিসাবের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চরম ও অস্বাভাবিক ঘটনার ঝুঁকি মাথায় রেখেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে হবে। যেসব ঘটনাকে আজ ব্যতিক্রমী বলা হচ্ছে, বাস্তবে সেগুলোই বারবার ঘটছে।

উদাহরণ হিসেবে যদি গড় ধরা হয় ৫০, তাহলে ৫০ এর কাছাকাছি হলো কম মান বিচ্যুতি এবং ৫০ এর বেশি হলো বেশি মান বিচ্যুতি) সহজভাবে বললে, গড় অবস্থা থেকে কোনো ঘটনা কতটা বেশি বা কম দূরে সরে যেতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।একটি সেতু বা নদীর পাশের মহাসড়ক যদি শুধু স্বাভাবিক গড় পরিস্থিতি মাথায় রেখে তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি মূলত শান্ত দিনের

গড় তথ্যের ভিত্তিতে নদীর তীর স্থিতিশীল হয়েছে বা স্থানীয় অর্থনীতি ১৫ শতাংশ বেড়েছে—এ ধরনের সাফল্য যথেষ্ট নয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo