ঝিনাইদহে বিজয় দিবসের আগেই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের নতুন ভাস্কর্য, কমিটি গঠন

- আপডেট সময় : ১১:০৯:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের জরাজীর্ণ ও অসম্পূর্ণ ভাস্কর্যটি অপসারণ করে আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগেই একটি নতুন ও পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ লক্ষ্যে যথাযথ স্থান নির্ধারণ, নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য ১৪ সদস্যের একটি সম্ভাব্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক প্রস্তুতিমূলক সভায় এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সভায় জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক নেতা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নবগঠিত কমিটিতে জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, জেলা পরিষদের প্রশাসক, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ও পৌরসভার প্রশাসক রথীন্দ্র নাথ রায়, জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের প্রতিনিধি, বীরশ্রেষ্ঠের ভাতিজা মো. হাফিজুর রহমান, ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সভাপতি আসিফ ইকবাল মাখন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সদস্য করা হয়েছে।
প্রস্তুতিমূলক সভার শুরুতে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা মো. হাফিজুর রহমান ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়কের সড়কদ্বীপে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে চত্বর ও ভাস্কর্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্য হিসেবে তারা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু গত ১৪ জুলাই তারা পত্রপত্রিকায় দেখতে পান যে ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। দিনের আলোতে কারা এই চত্বর ও ভাস্কর্য ভেঙে ফেলছিল, তা প্রশাসনের কেউ বলতে পারেনি এবং পৌরসভাও তাদের কিছু জানায়নি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু তাদের পরিবারের নন, বরং পুরো দেশ ও ঝিনাইদহের গর্ব। তার ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার বিষয়টি তারা মেনে নিতে পারছেন না এবং একই স্থানে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য ও চত্বর পুনর্নির্মাণের দাবি জানান।
সভায় জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান আমাদের গর্ব এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মহান স্বাধীনতার ঘোষক। আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করি, তাই বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্যের কোনো অবমাননা হতে দেওয়া হবে না। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত দিনে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বরের কোনো প্রচার ছিল না। মহাসড়কের মাঝখানের এই স্থাপনাটি অজানা কারণে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার বন্ধ করে দেয় এবং সেখানে ব্যাপক লুটপাট হয়। কাজ শেষ না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এটি মাদকসেবী ও নোংরা পরিবেশের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। এখন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে শহরের একটি উপযুক্ত স্থানে স্থায়ীভাবে এই ভাস্কর্য পুনঃস্থাপনের ব্যাপারে দীর্ঘস্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামালউদ্দিন বলেন, কাজ অসমাপ্ত থাকায় অনেকেই জানতেন না সেখানে আসলে কার ভাস্কর্য ছিল। সম্প্রতি যখন তারা জানতে পারেন যে কে বা কারা এটি ভেঙে সরিয়ে দিচ্ছে, তখনই তারা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেই অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য ও চত্বর অপসারণের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তিনি দ্রুততম সময়ে একটি নিরাপদ স্থানে বীরশ্রেষ্ঠের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য স্থাপনের দাবি জানান, যেখানে মানুষ নিরাপদে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবে।
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে স্থাপিত চত্বরটি ২০১৯ সাল থেকেই পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়েছিল, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখন জেলা শহরের একটি দর্শনীয় ও প্রাণকেন্দ্রে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে আগামী বিজয় দিবসের আগেই যেন এটি উদ্বোধন করা যায়। গঠিত ১৪ সদস্যের কমিটি দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত জায়গা বাছাই করবে এবং প্রয়োজনে কমিটিতে আরও দু-একজন সদস্য বাড়ানো হতে পারে।
উল্লেখ্য, ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর ও ভাস্কর্য ভাঙার কাজ গত ১৩ জুলাই থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত চলেছিল। তবে কার নির্দেশে এটি ভাঙা হচ্ছিল, সে বিষয়ে প্রশাসন বা পৌরসভা কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এ নিয়ে গত ১৬ জুলাই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে শনিবার জেলা প্রশাসন ভাঙার কাজ স্থগিত করে। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন লিংক সড়কে ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের এই চত্বর নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পার হলেও এবং দুই দফা মেয়র ও প্রশাসক পরিবর্তন হলেও কাজ শেষ করা হয়নি। কাজ শেষ না হওয়ায় ভাস্কর্যটির পূর্ণাঙ্গ আকৃতিও ছিল না এবং সেখানে আগাছা জন্ম নিয়েছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভাস্কর্যটি হামলার শিকারও হয়। স্থানীয়দের দাবি, অতিরিক্ত উচ্চতার কারণে চারমুখী মোড়ে যান চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় কাজ অসমাপ্ত রেখেই এর নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।


























