খেলাপি ঋণ আদায়ে নতুন আইন ও বিশেষ কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ
- আপডেট সময় : ১২:৩১:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রধান সংকট ‘পাহাড় সমান’ খেলাপি ঋণ থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ খেলাপি ঋণ কেনা, আদায় করা এবং প্রয়োজনে জামানত বিক্রির সুযোগ রেখে একটি নতুন আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন’ বা ডামা আইনের আওতায় বিশেষায়িত বেসরকারি কোম্পানি গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে, যারা মূলত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। ইতিমধ্যে বিভাগটি সবার মতামতের জন্য আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন, ২০২৫’ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি, অবলোপন করা, পুনঃ তফসিল করা এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ মিলিয়ে মোট সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা, মামলা ও দুর্বল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার কারণে এই বিপুল অর্থ আটকে আছে, যা ব্যাংকের স্থিতিপত্রকে দুর্বল করার পাশাপাশি নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত আইনের বিপরীতে তারা সবার মতামত প্রত্যাশা করছেন।
নতুন খসড়া অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ গঠিত হবে। এটি একটি স্বতন্ত্র আইনগত সত্তা হিসেবে কাজ করবে এবং বেসরকারি খাতে সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ও লোন সার্ভিসার কোম্পানিকে লাইসেন্স প্রদান করবে। ব্যাংকগুলো চাইলে তাদের খেলাপি ঋণ এই কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করতে পারবে। এছাড়া এই ইউনিট খেলাপি সম্পদের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার পরিচালনা করবে এবং সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নীতিগত পরামর্শ দেবে।
সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের ক্ষেত্রে কঠোর শর্তারোপ করা হয়েছে। কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধিত হওয়ার পাশাপাশি পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের ব্যাংকিং, অর্থনীতি বা আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে এবং পর্ষদে অন্তত ২০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক থাকতে হবে। এসব কোম্পানি শুধুমাত্র জামানত বিক্রি নয়, বরং ঋণ পুনর্গঠন, নতুন বিনিয়োগকারী আনা, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর কিংবা ব্যবসার অংশ বিক্রির মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে। পাশাপাশি ঋণ সেবাদাতা কোম্পানিগুলো গ্রাহকের সাথে আলোচনা ও আইনি সহায়তার কাজ করবে, তবে তারা কোনো আমানত গ্রহণ বা জোরপূর্বক ঋণ আদায় করতে পারবে না।
এই আইনের আওতায় খেলাপি ঋণ একত্র করে বন্ড বা সিকিউরিটি ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান প্রস্তাবিত ডামা আইনকে কার্যকর করতে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, আইনি জটিলতা দূরীকরণ এবং জামানত হস্তান্তরের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, অতীতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি থাকলেও তাদের কার্যপদ্ধতি ছিল বিতর্কিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এবারের উদ্যোগে অতীতের মতো দুর্বলতা থাকবে না।
নতুন এই আইন কার্যকর হলে ব্যাংকগুলো তাদের অচল ঋণ সরিয়ে নতুন ঋণ বিতরণে সক্ষম হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এ খাতে আগ্রহী হয়ে উঠবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।




























