ঢাকা ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ঢাকায় অতিবৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, জনজীবনে চরম ভোগান্তি বহর বাড়াচ্ছে ইউএস-বাংলা, ২০২৭ সালে যুক্ত হবে ২১টি নতুন বোয়িং সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা সোমবার একদিনের সফরে বরিশাল যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মিটফোর্ড এলাকায় ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যা: ২১ আসামির বিচার শুরু সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড: কার জয়ের সম্ভাবনা বেশি? সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত সোমবার বরিশাল সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফরাসি ফুটবলের অদ্ভুত কুসংস্কার ও ঐতিহাসিক সব মজার গল্প যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুতে ইসরায়েলি নেতাদের শোক

ঢাকায় অতিবৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, জনজীবনে চরম ভোগান্তি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪৯:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

শনিবার দিবাগত রাত ও রবিবার দিনের প্রথম ভাগে হওয়া অতিবৃষ্টিতে ঢাকা শহর কার্যত ডুবে গিয়েছিল। এতে নগরবাসীর সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক এলাকার সড়কে যানবাহন বিকল হয়ে পড়েছিল এবং বহু মানুষের ঘরেও পানি ঢুকেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা স্থগিত ও ক্লাস বাতিল করে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক সোহরাব সরদার রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর কাজীপাড়ায় হাঁটুপানিতে বিকল হওয়া মোটরসাইকেল ঠেলছিলেন। মিরপুর ১০ নম্বরে যাত্রী নামিয়ে ফেরার পথে তাঁর মোটরসাইকেলে পানি ঢুকে বিকল হয়ে যায়। সেটিকে ঠেলে মগবাজার নিয়ে সারানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। এতে পুরো দিনে আর কোনো আয় হবে না বলে তিনি জানান।

নগর-পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকায় এত বেশি বৃষ্টির কারণে জলজট হতে পারে, কিন্তু জলাবদ্ধতা হলে তা ব্যর্থতা। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা সাধারণত অল্প সময় পানি জমে থাকাকে ‘সাময়িক জলজট’ বলেন। নগর-পরিকল্পনার সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে নালার তাৎক্ষণিক ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যে পানি জমে এবং বৃষ্টি কমার পর দ্রুত নেমে যায়, সেটিই জলজট। অন্যদিকে নালা, খাল, কালভার্ট বা আউটলেট বন্ধ, সরু বা বিচ্ছিন্ন থাকায় পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকা এবং একই এলাকায় বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই জলাবদ্ধতা। গতকালের বৃষ্টিতে ঢাকার কিছু এলাকায় পানি দ্রুত নেমে গেলেও অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে তা আটকে ছিল, যা জলাবদ্ধতার বড় সমস্যা নির্দেশ করে।

নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, জলাবদ্ধতার প্রধান দুটি কারণ হলো পানি নেমে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পথের অভাব এবং খালগুলো বেদখল, ভরাট ও আবর্জনায় পূর্ণ থাকা। যে ড্রেন বা নালা দিয়ে পানি নেমে যাবে, সেগুলোও বালু ও আবর্জনায় ভরে গেছে। ঢাকা উত্তর সিটির প্রকৌশল বিভাগ জানায়, ২৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে পানি নেমে যায়। এর বেশি হলে সময় লাগে। গতকাল সংস্থাটি পানি সরানোর কাজে বাড়তি জনবল নিয়োগ করেছিল। একইভাবে দক্ষিণ সিটিও চেষ্টা করেছে বলে দাবি করেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার এবং সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আরও ৮২ মিলিমিটার, অর্থাৎ ১২ ঘণ্টায় মোট ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ ঘণ্টায় ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টির পর রাজধানীর কিছু সড়ক থেকে ১৫ ঘণ্টায়ও পানি নামেনি। এর আগের বছর এক দিনে ঢাকায় ২৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৩ ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু এলাকা ডুবে যায়।

গতকাল রবিবার সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, বনানী-কাকলী, বাড্ডা, খিলগাঁও, মগবাজার, মোহাম্মদপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, নিউমার্কেট, আজিমপুর, মতিঝিল, শ্যামপুর ও কদমতলী। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চলমান খোঁড়াখুঁড়ি মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও ঢাকা কলেজের সামনের সড়কে পানি এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে সড়ক ও ফুটপাতের সীমানা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সকাল থেকে নিউমার্কেটের সব দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির অফিস সেক্রেটারি ফিরোজ উল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি দেখে সোমবার দোকান খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নিউমার্কেট এলাকার জলাবদ্ধতা সমাধানের গাফিলতির একটি উদাহরণ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিউমার্কেটের জলাবদ্ধতা নতুন নয়। আগে নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকার পানি পিলখানার একটি নালা দিয়ে বুড়িগঙ্গায় যেত। ২০০৯ সালের পর নিরাপত্তার কারণে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু নতুন কোনো কার্যকর পথ তৈরি করা হয়নি। ফলে বৃষ্টি বেশি হলেই ওই এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটিতে ২৯টি খাল রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৫ কিলোমিটার। খোলা ও পাইপ-নালা মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। দক্ষিণ সিটিতে রয়েছে ২৬টি খাল এবং ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি নালা-নর্দমা। নথিপত্রে এত খাল-নালা থাকলেও পানি নামার পুরো পথ সচল নয়। বৃষ্টির পানি সড়ক থেকে নালায়, পরে কালভার্ট ও খাল হয়ে ‘আউটলেট’ দিয়ে নদীতে যাওয়ার কথা। এই পথের কোনো একটি অংশ বন্ধ, সরু বা বিচ্ছিন্ন হলে পুরো ব্যবস্থার সক্ষমতা কমে যায়।

দক্ষিণ সিটির পানি মূলত তিনটি আউটলেট দিয়ে নদীতে যাওয়ার কথা। দোলাইপাড় পাম্পস্টেশনের তিনটি পাম্পের প্রতিটি প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ হাজার লিটার পানি সরাতে পারে। কমলাপুরের টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনের তিনটি পাম্পের মধ্যে দুটি সচল। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যান্ত্রিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কোথাও নালার মুখ বর্জ্য ও পলিতে বন্ধ, কোথাও কালভার্ট সরু, আবার কোথাও খালের সঙ্গে নালার সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে পানি পাম্প পর্যন্ত না পৌঁছালে উচ্চক্ষমতার পাম্পও কাজে আসে না।

দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান রবিবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি তাৎক্ষণিকভাবে এবং ৩০ থেকে ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টায় সরানো সম্ভব। গতকালের বৃষ্টি সেই সক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি ছিল।

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, ঢাকায় বেশি বৃষ্টি বিরল ঘটনা নয়। এত টাকা খরচের পরও সেই প্রস্তুতি কেন নেই? নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, ঢাকায় প্রাকৃতিক জলপথ ও কৃত্রিম নালাকে যুক্ত করে সমন্বিত পানিনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেই ‘আউটলেট’ সচল করা হচ্ছে না। শুধু যেখানে পানি জমে, সেখানে নতুন নালা বানিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ এক দশকে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা খরচ করেছে নালা নির্মাণ ও সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যান্য কাজে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০—এই পাঁচ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ এবং উত্তর সিটি ৭১১ কোটি টাকা খরচ করে। একই সময়ের কাছাকাছি ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। সব মিলিয়ে ব্যয় হয় প্রায় ১ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ থেকে পানিনিষ্কাশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরবর্তী চার বছরে দুই সিটি আরও অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করে। দুই সময়ের অঙ্ক যোগ করলে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার বেশি।

প্রশ্ন হলো, নালা নির্মাণ করা হলেও পানি যাওয়ার শেষ পথটি সচল হয়েছে কি না। অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়নি। এ কারণে এত ব্যয়ের পরও দুই সিটি গত এপ্রিলে ঢাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ ১৪১টি স্থান চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ১০৮টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ৩৩টি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম রবিবার প্রথম আলোকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত সময়ে মন্ত্রী ও মেয়ররা যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল ছিল না। মুখরোচক বক্তব্য না দিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে। জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে হলে পানিনিষ্কাশনের পথ বাড়াতে হবে।

গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঢাকার অনেক জায়গায় পানি জমে ছিল। ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালক সোহরাব সরদার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি গতকাল ৩০০ টাকা আয় করেছিলেন। মোটরসাইকেল ঠেলে ঠেলে মগবাজার নিয়ে মেরামত করাতে সেই ৩০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আর পথে নামতে পারেননি তিনি।

বলেছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন (২০১৭ সালে) এবং ঢাকা দক্ষিণের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস (২০২৩ সালে)।

কিন্তু জলাবদ্ধতা যায়নি।.২০২৫ সালে কত খরচ হয়েছে, সে হিসাব পাওয়া যায়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ঢাকায় অতিবৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, জনজীবনে চরম ভোগান্তি

আপডেট সময় : ০২:৪৯:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
print news

শনিবার দিবাগত রাত ও রবিবার দিনের প্রথম ভাগে হওয়া অতিবৃষ্টিতে ঢাকা শহর কার্যত ডুবে গিয়েছিল। এতে নগরবাসীর সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক এলাকার সড়কে যানবাহন বিকল হয়ে পড়েছিল এবং বহু মানুষের ঘরেও পানি ঢুকেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা স্থগিত ও ক্লাস বাতিল করে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক সোহরাব সরদার রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর কাজীপাড়ায় হাঁটুপানিতে বিকল হওয়া মোটরসাইকেল ঠেলছিলেন। মিরপুর ১০ নম্বরে যাত্রী নামিয়ে ফেরার পথে তাঁর মোটরসাইকেলে পানি ঢুকে বিকল হয়ে যায়। সেটিকে ঠেলে মগবাজার নিয়ে সারানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। এতে পুরো দিনে আর কোনো আয় হবে না বলে তিনি জানান।

নগর-পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকায় এত বেশি বৃষ্টির কারণে জলজট হতে পারে, কিন্তু জলাবদ্ধতা হলে তা ব্যর্থতা। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা সাধারণত অল্প সময় পানি জমে থাকাকে ‘সাময়িক জলজট’ বলেন। নগর-পরিকল্পনার সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে নালার তাৎক্ষণিক ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যে পানি জমে এবং বৃষ্টি কমার পর দ্রুত নেমে যায়, সেটিই জলজট। অন্যদিকে নালা, খাল, কালভার্ট বা আউটলেট বন্ধ, সরু বা বিচ্ছিন্ন থাকায় পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকা এবং একই এলাকায় বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই জলাবদ্ধতা। গতকালের বৃষ্টিতে ঢাকার কিছু এলাকায় পানি দ্রুত নেমে গেলেও অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে তা আটকে ছিল, যা জলাবদ্ধতার বড় সমস্যা নির্দেশ করে।

নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, জলাবদ্ধতার প্রধান দুটি কারণ হলো পানি নেমে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পথের অভাব এবং খালগুলো বেদখল, ভরাট ও আবর্জনায় পূর্ণ থাকা। যে ড্রেন বা নালা দিয়ে পানি নেমে যাবে, সেগুলোও বালু ও আবর্জনায় ভরে গেছে। ঢাকা উত্তর সিটির প্রকৌশল বিভাগ জানায়, ২৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে পানি নেমে যায়। এর বেশি হলে সময় লাগে। গতকাল সংস্থাটি পানি সরানোর কাজে বাড়তি জনবল নিয়োগ করেছিল। একইভাবে দক্ষিণ সিটিও চেষ্টা করেছে বলে দাবি করেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার এবং সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আরও ৮২ মিলিমিটার, অর্থাৎ ১২ ঘণ্টায় মোট ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ ঘণ্টায় ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টির পর রাজধানীর কিছু সড়ক থেকে ১৫ ঘণ্টায়ও পানি নামেনি। এর আগের বছর এক দিনে ঢাকায় ২৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৩ ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু এলাকা ডুবে যায়।

গতকাল রবিবার সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, বনানী-কাকলী, বাড্ডা, খিলগাঁও, মগবাজার, মোহাম্মদপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, নিউমার্কেট, আজিমপুর, মতিঝিল, শ্যামপুর ও কদমতলী। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চলমান খোঁড়াখুঁড়ি মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও ঢাকা কলেজের সামনের সড়কে পানি এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে সড়ক ও ফুটপাতের সীমানা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সকাল থেকে নিউমার্কেটের সব দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির অফিস সেক্রেটারি ফিরোজ উল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি দেখে সোমবার দোকান খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নিউমার্কেট এলাকার জলাবদ্ধতা সমাধানের গাফিলতির একটি উদাহরণ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিউমার্কেটের জলাবদ্ধতা নতুন নয়। আগে নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকার পানি পিলখানার একটি নালা দিয়ে বুড়িগঙ্গায় যেত। ২০০৯ সালের পর নিরাপত্তার কারণে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু নতুন কোনো কার্যকর পথ তৈরি করা হয়নি। ফলে বৃষ্টি বেশি হলেই ওই এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটিতে ২৯টি খাল রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৫ কিলোমিটার। খোলা ও পাইপ-নালা মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। দক্ষিণ সিটিতে রয়েছে ২৬টি খাল এবং ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি নালা-নর্দমা। নথিপত্রে এত খাল-নালা থাকলেও পানি নামার পুরো পথ সচল নয়। বৃষ্টির পানি সড়ক থেকে নালায়, পরে কালভার্ট ও খাল হয়ে ‘আউটলেট’ দিয়ে নদীতে যাওয়ার কথা। এই পথের কোনো একটি অংশ বন্ধ, সরু বা বিচ্ছিন্ন হলে পুরো ব্যবস্থার সক্ষমতা কমে যায়।

দক্ষিণ সিটির পানি মূলত তিনটি আউটলেট দিয়ে নদীতে যাওয়ার কথা। দোলাইপাড় পাম্পস্টেশনের তিনটি পাম্পের প্রতিটি প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ হাজার লিটার পানি সরাতে পারে। কমলাপুরের টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনের তিনটি পাম্পের মধ্যে দুটি সচল। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যান্ত্রিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কোথাও নালার মুখ বর্জ্য ও পলিতে বন্ধ, কোথাও কালভার্ট সরু, আবার কোথাও খালের সঙ্গে নালার সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে পানি পাম্প পর্যন্ত না পৌঁছালে উচ্চক্ষমতার পাম্পও কাজে আসে না।

দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান রবিবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি তাৎক্ষণিকভাবে এবং ৩০ থেকে ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টায় সরানো সম্ভব। গতকালের বৃষ্টি সেই সক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি ছিল।

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, ঢাকায় বেশি বৃষ্টি বিরল ঘটনা নয়। এত টাকা খরচের পরও সেই প্রস্তুতি কেন নেই? নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, ঢাকায় প্রাকৃতিক জলপথ ও কৃত্রিম নালাকে যুক্ত করে সমন্বিত পানিনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেই ‘আউটলেট’ সচল করা হচ্ছে না। শুধু যেখানে পানি জমে, সেখানে নতুন নালা বানিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ এক দশকে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা খরচ করেছে নালা নির্মাণ ও সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যান্য কাজে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০—এই পাঁচ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ এবং উত্তর সিটি ৭১১ কোটি টাকা খরচ করে। একই সময়ের কাছাকাছি ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। সব মিলিয়ে ব্যয় হয় প্রায় ১ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ থেকে পানিনিষ্কাশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরবর্তী চার বছরে দুই সিটি আরও অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করে। দুই সময়ের অঙ্ক যোগ করলে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার বেশি।

প্রশ্ন হলো, নালা নির্মাণ করা হলেও পানি যাওয়ার শেষ পথটি সচল হয়েছে কি না। অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়নি। এ কারণে এত ব্যয়ের পরও দুই সিটি গত এপ্রিলে ঢাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ ১৪১টি স্থান চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ১০৮টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ৩৩টি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম রবিবার প্রথম আলোকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত সময়ে মন্ত্রী ও মেয়ররা যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল ছিল না। মুখরোচক বক্তব্য না দিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে। জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে হলে পানিনিষ্কাশনের পথ বাড়াতে হবে।

গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঢাকার অনেক জায়গায় পানি জমে ছিল। ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালক সোহরাব সরদার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি গতকাল ৩০০ টাকা আয় করেছিলেন। মোটরসাইকেল ঠেলে ঠেলে মগবাজার নিয়ে মেরামত করাতে সেই ৩০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আর পথে নামতে পারেননি তিনি।

বলেছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন (২০১৭ সালে) এবং ঢাকা দক্ষিণের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস (২০২৩ সালে)।

কিন্তু জলাবদ্ধতা যায়নি।.২০২৫ সালে কত খরচ হয়েছে, সে হিসাব পাওয়া যায়নি।