একাত্তরের ক্ষমা ও নেতৃত্ব আধুনিকায়নে জামায়াতকে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের ৫ পরামর্শ
- আপডেট সময় : ০৯:০৩:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বর্তমানে এক অনিশ্চিত অবস্থায় ঝুলে রয়েছে বলে মূল্যায়ন করে গেছেন দলটির সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের প্রয়াত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। তাঁর মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে এবং নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে দলটিকে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়াসহ মৌলিক সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে। ২০২৫ সালের ৪ মে প্রয়াত হওয়ার আগে তিনি ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ শিরোনামে একটি বই লিখে যান, যা গত মাসে প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)। বইটির শেষ অধ্যায় ‘জামায়াতের সামনে এগোনোর পথ’-এ দলটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন তিনি।
বইটিতে আবদুর রাজ্জাক উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৭১ সালের ছায়া এখনো জামায়াতের ওপর গভীরভাবে বজায় রয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি দলটির তীব্র বিরোধিতাই জনগণের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের মূল কারণ। বহু মানুষের কাছে জামায়াত কেবল একটি বেদনাদায়ক অতীত নয়, বরং এমন এক দল যারা নিজেদের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডের জন্য এখনো পুরোপুরি জবাবদিহি করেনি। মাঝেমধ্যে ক্ষমা চাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও তা সংশয়ের মুখে পড়ে। তিনি মনে করেন, প্রকৃত স্বীকৃতি ও আন্তরিক দায় স্বীকার ছাড়া পুনর্সমঝোতার যেকোনো চেষ্টা জনসাধারণের কাছে ফাঁপা মনে হতে পারে। অতীতের মুখোমুখি হতে জামায়াতের অনীহাকে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার ভুল উপলব্ধি হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ১৯৭১ সাল যেখানে জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি, সেখানে এই ইতিহাসকে উপেক্ষা করা দলটিকে জনগণের কাছ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করবে।
সাংগঠনিক অনমনীয়তা ও রক্ষণশীল কাঠামোকে জামায়াতের পুনরুজ্জীবনের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আবদুর রাজ্জাক। দেশের দ্রুত আধুনিকায়ন ও পরিবর্তনশীল জনমিতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে দলটি এখনো অতীতের রক্ষণশীলতায় আটকে আছে। ফলে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে দলটির দূরত্ব বাড়ছে। তরুণেরা এমন নেতৃত্ব ও নীতি চান যা বর্তমানের বাস্তবতাকে মোকাবিলা করবে। কিন্তু জামায়াত এখনো বয়স্ক ও রক্ষণশীল অভিজাতদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। দলের গতিপথ নির্ধারণে তরুণ কর্মীদের খুব কম সুযোগ দেওয়া হয় এবং তাদের বাস্তববাদী ও উদ্ভাবনী ধারণাগুলো উপেক্ষিত থাকে। নতুন কণ্ঠস্বরের জন্য দরজা উন্মুক্ত না করলে দলটি আরও বেশি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ায় শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দলটির জন্য বড় আঘাত ছিল উল্লেখ করে আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, এই বিচার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জামায়াত তা নিজেদের পক্ষে জনসমর্থনে রূপান্তর করতে পারেনি। এছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও যুবনীতির মতো সমসাময়িক বিষয়ে সম্পৃক্ত হতে না পারায় শিক্ষিত ও শহুরে ভোটারদের বড় অংশ দলটি থেকে দূরে সরে গেছে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও আইনি চ্যালেঞ্জের জবাবে জামায়াত কেবল নিজেদের নিপীড়িত হিসেবে তুলে ধরার যে আত্মরক্ষামূলক কৌশল নিয়েছে, তা জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পেতে হলে দলটিকে অভিযোগের রাজনীতি থেকে বের হয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।
বিশ্বের অন্যান্য ইসলামপন্থী আন্দোলনের উদাহরণ টেনে আবদুর রাজ্জাক দেখিয়েছেন কীভাবে তারা নিজেদের আধুনিকায়ন করেছে এবং আদর্শের সঙ্গে নতুন বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়নের মতো সামাজিক ইস্যুতে মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু জামায়াত পুরোনো বয়ানেই আটকে রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় জামায়াতের এই কৌশলগত দূরদর্শিতার অভাব বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নিয়ে বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করলেও নীতি ও শাসনব্যবস্থায় সুস্পষ্ট অবস্থান না থাকায় দলটি সেই ত্যাগকে রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করতে পারেনি এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ হারিয়েছে।
১৯৮৬ সালে জামায়াতে যোগ দেওয়া আবদুর রাজ্জাক ২০০৩ সালে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হন। ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়ার জেরে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দল থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। জামায়াতকে টিকিয়ে রাখতে ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠিত করতে বইয়ের শেষ অংশে তিনি পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন:
১. অতীতের মুখোমুখি হওয়া: ১৯৭১ সালে নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং প্রকৃত জবাবদিহির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া।২. নেতৃত্বের আধুনিকায়ন: তরুণ ও সংস্কারপন্থী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা, যাঁরা বর্তমান সময়ের ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম।৩. রাজনৈতিক কর্মসূচির বৈচিত্র্য আনা: আদর্শগত অনমনীয়তার বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া।৪. তরুণদের সম্পৃক্ত করা: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচিত তরুণদের আকৃষ্ট করে, এমন বয়ান ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।৫. আস্থা পুনর্গঠন: নাগরিক সমাজের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে উন্মুক্ত ও গঠনমূলক সংলাপে অংশ নেওয়া।




























