সংবিধানে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা যুক্ত করার উদ্যোগ
- আপডেট সময় : ০৭:৩৪:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬ ২৮ বার পড়া হয়েছে

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানকে প্রথমবারের মতো সংবিধানে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়ার দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণাটি সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আজ বেলা ১২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে এই বিশেষ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির সভাপতি, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে পরিচিতিপর্ব ছাড়াও সংবিধানের কোন কোন জায়গায় সংশোধনী আনা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনী সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায় এবং জুলাই সনদকে সামনে রেখে বিভিন্ন প্রস্তাবনা কমিটির সদস্যদের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর মধ্যে রয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হওয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি, তার ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং তার প্রতিকৃতি টানানোর বাধ্যবাধকতা বাতিল করা। আদালতের রায় মেনে সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে প্রথম ভাগের ৪-এর (ক), ৭-এর ১ (ক), (খ), ৭-এর ২, ৭-এর ৩, ৭-এর (খ) ও ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ। এছাড়া সংবিধানের শেষে যুক্ত করা দুটি তফসিল—পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল—বাদ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তিনটি নতুন তফসিল যুক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে পঞ্চম তফসিলে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, ষষ্ঠ তফসিলে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সপ্তম তফসিলে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল।
সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগের ৮-এর ১ অনুচ্ছেদে থাকা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—এবং ৯ অনুচ্ছেদে ‘বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি’—এই অংশগুলোতেও পরিবর্তনের চিন্তা রয়েছে। ‘বাঙালি’র জায়গায় ‘বাংলাদেশি’ শব্দ যুক্ত করার বিষয়টি ভাবনায় আছে। এছাড়া সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও জুলাই যোদ্ধাদের অবদানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
কমিটির সদস্যদের পক্ষ থেকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ রাখা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, একাধিক ডেপুটি স্পিকারের পদ সৃষ্টি এবং নারী সদস্যদের আসন সংখ্যা বাড়ানো। এছাড়া নৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যদের সদস্যপদ বাতিলের নতুন বিধান যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে ৫৫টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়। উচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি সংক্রান্ত আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচনব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো গণতন্ত্র ও জনগণের সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করা হয়েছে, যার ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়। আদালত আরও বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের কথা ছিল, যা পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়; আদালত এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত ৪২ ধারা বাতিল করে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করেছেন। এছাড়া ৭-এর (ক) অনুচ্ছেদকে আদালত অস্পষ্ট ও ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে বাতিল করেন।
সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য সম্পর্কে ৭-এর খ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহ, তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলি সংশোধনের অযোগ্য। এই বিধানটিও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিল।
গত ১৩ জুলাই সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদে এই কমিটির নাম উপস্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাশ হয়। ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধী দল নাম না দেওয়ায় ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রাখা হলেও এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো নাম দেয়নি।
সংবিধানের ৪৪ (২) অনুচ্ছেদে বলা ছিল, ‘এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটাইয়া সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোন আদালতকে তাহার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ঐ সকল বা উহার যে কোন ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করিতে পারিবেন।’ আদালত একে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে বাতিল করে দেয়। রায়ে বলা হয়, ‘সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের কথা ছিল, যা পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়। এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪২ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিবেচনায় তা বাতিল ঘোষণা করা হলো এবং দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হলো।’
জানা গেছে, আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংবিধান সংশোধন কমিটি ৭-এর ১ (ক), (খ), ৭-এর ২, ৭-এর ৩, ৭-এর (খ) এবং ৪৪-এর ২ অনুচ্ছেদটি বাদ দেবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে থাকা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার চারটি মূল মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতি পঞ্চম সংশোধানীর মাধ্যমে পুর্নবহাল করা হয়। এছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান; সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটব্যবস্থা বাতিল এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। কমিটির সদস্যরা এগুলো সংবিধানে না রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন।





























