সম্প্রীতির বাংলাদেশ: অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
- আপডেট সময় : ০৮:৪৯:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

ছোটবেলা থেকেই আমরা দলবেঁধে পূজামণ্ডপে যাওয়ার স্মৃতি বহন করি। আজও বাংলাদেশের শহর, গ্রাম কিংবা পাড়া-মহল্লায় যেখানেই পূজামণ্ডপ রয়েছে, সেখানেই মানুষ দলমতনির্বিশেষে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই শারদীয় উৎসব যেমন আমাদের আনন্দের উপলক্ষ, তেমনি ঈদ-পার্বণেও ভিন্নধর্মাবলম্বী বন্ধুরা আমাদের শুভেচ্ছা জানান। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বড়দিন উদ্যাপন কিংবা পূজার নাড়ুর স্বাদ—এসবই বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সৌন্দর্য ও সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুগ যুগ ধরে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ এখানে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। ধর্মীয় উপাসনা পদ্ধতিতে ভিন্নতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বন্ধন এদেশের জাতীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক শক্তির মূল ভিত্তি। প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার, হিন্দুধর্মের ঐতিহ্য এবং পরবর্তীতে ইসলামের আগমন সমাজ ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান উৎসবের মতো রাষ্ট্রীয় আয়োজনে দেশ-বিদেশ থেকে নানা ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণই প্রমাণ করে যে, বাংলার মাটিতে ধর্মের কোনো বিভেদ নেই।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, 'মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান'। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। ১৯৭১ সালের সেই ত্যাগের ইতিহাস প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষের প্রকৃত পরিচয় কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের সম্মিলিত পরিচয় বাংলাদেশি। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা কিংবা বড়দিনের মতো উৎসবগুলো এ দেশের সামাজিক জীবনে সৌহার্দ্যের আবহ তৈরি করে। এছাড়া বাংলা নববর্ষ, নবান্ন উৎসব ও লোকজ মেলাগুলো সব ধর্মের মানুষকে একই বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে।
সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান অধিকার স্বীকৃত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক বৈষম্য বা নির্যাতনের শিকার হতে পারেন না। এই সাংবিধানিক আদর্শ বাস্তবায়নে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, অপরাধীদের নিরপেক্ষ বিচার ও গুজব প্রতিরোধ অপরিহার্য। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ধর্মের মূল শিক্ষা সত্য, ন্যায় ও মানবকল্যাণকে ধারণ করে ভিন্নমত ও বিশ্বাসকে সম্মান জানানোই উন্নত সমাজের পরিচয়। ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’—এই চেতনা নিয়ে প্রতিটি নাগরিকের মানবিক গুণাবলি ও কর্মের মাধ্যমে সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই আমাদের প্রত্যাশা।

























