মার্কিন আদালত ও সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে যেভাবে গর্জে উঠেছিল গিন্সবার্গের ‘হাউল’
- আপডেট সময় : ০৯:৫১:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

১৯৫৫ সালের ৭ অক্টোবর সান ফ্রান্সিসকোর সিক্স গ্যালারিতে এক ছোট সমাবেশের সামনে দাঁড়িয়ে তরুণ কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ প্রথমবারের মতো পাঠ করেছিলেন তাঁর দীর্ঘ কবিতা ‘হাউল’। যুদ্ধের কবলে পড়া পরবর্তী আমেরিকার কৃত্রিম ভদ্রতা ও শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এই কবিতাটি যে একদিন মার্কিন আদালতে দাঁড়িয়ে বাক্স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলবে, তা তখন কেউ ভাবেনি। বিট জেনারেশনের এই অমর সৃষ্টি তৎকালীন মার্কিন সমাজের সেন্সরশিপ, সমকামিতার ওপর নিপীড়ন ও নৈতিকতার নামে চালানো নজরদারির বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য বিদ্রোহে পরিণত হয়েছিল।
কবিতাটির সৃষ্টির পেছনে রয়েছে এক গভীর ব্যক্তিগত ও মানসিক সংকটের ইতিহাস। ১৯৫৫ সালের ৮ জুন এক স্বপ্নের মধ্য দিয়ে গিন্সবার্গ ‘হাউল’ লেখা শুরু করেন। স্বপ্নে তাঁর কাছে ফিরে এসেছিলেন ১৯৫১ সালে মেক্সিকোতে মারা যাওয়া বন্ধু জোয়ান ভলমার। তাঁর হাত ধরেই কবির স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সমাজের মূলধারা থেকে ছিটকে পড়া বন্ধু, প্রেমিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সব মানুষের মুখ। গিন্সবার্গ নিজেও মানসিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং ১৯৪৯ ও ১৯৫০ সালে আট মাস নিউইয়র্ক স্টেট সাইকিয়াট্রিক ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর মা এবং দীর্ঘদিনের সঙ্গী পিটার অরলভস্কিও মানসিক অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ফলে ‘হাউল’-এর লাইনে লাইনে থাকা উন্মাদনা কোনো কাল্পনিক চিত্র ছিল না, তা ছিল তাঁর ভেতর থেকে আসা বাস্তব আগুন।
১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে যখন ‘হাউল অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ বইটির ৫২০টি কপি ব্রিটেন থেকে আমদানি করার সময় মার্কিন কাস্টমস তা অশ্লীলতার অভিযোগে জব্দ করে, তখন থেকেই শুরু হয় আইনি লড়াই। এরপর ছদ্মবেশী পুলিশ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সিটি লাইটস বুকস থেকে বইটি কিনে গ্রেপ্তার করা হয় দোকানের মালিক লরেন্স ফেরলিঙ্গেট্টি এবং ব্যবস্থাপক শিগ মুরাওকে। কবিতাটির বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল—এটি যৌনতা, মাদক, সমকামিতা ও মানসিক অসুস্থতার মতো বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা তৎকালীন রক্ষণশীল আমেরিকা আড়াল করতে চেয়েছিল। গবেষক জোনাহ রাসকিনের মতে, এই কবিতার পরতে পরতে ছিল এক ‘সংক্রামক অবাধ্যতা’।
কবিতাটিতে বারবার ফিরে আসা ‘মোলোখ’ শব্দটি কেবল একটি ধর্মীয় প্রতীক ছিল না। গিন্সবার্গের কাছে মোলোখ ছিল পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামরিক-শিল্প কাঠামো এবং মানুষের আত্মাকে যন্ত্রে পরিণত করার লোভী সভ্যতার এক প্রতীকী দানব। এই দানবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই গিন্সবার্গ লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত লাইন—‘আমি দেখেছি আমার সময়ের শ্রেষ্ঠ মেধাগুলো উন্মাদনায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে— ক্ষুধার্ত, উন্মত্ত, নগ্ন।’
১৯৫৭ সালের ১৬ আগস্ট শুরু হওয়া এই ঐতিহাসিক বিচারে ডিফেন্সের পক্ষে দাঁড়ায় আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন। নয়জন বিশিষ্ট পণ্ডিত ও অধ্যাপক আদালতে এসে কবিতাটির সাহিত্যিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। অবশেষে ১৯৫৭ সালের ৩ অক্টোবর বিচারক ক্লেটন হর্ন রায় দেন যে, ‘হাউল’ অশ্লীল নয়। তিনি তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন, কোনো সাহিত্যকর্মের কিছু বিচ্ছিন্ন শব্দ দিয়ে তার বিচার করা চলে না, বরং তার সামগ্রিক সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনা করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শব্দকে যদি এভাবে শৃঙ্খলিত করা হয়, তবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বা বাক্স্বাধীনতা কীভাবে বজায় থাকবে?
এই রায়ের পর ‘হাউল’ একটি সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণে রূপ নেয় এবং পরবর্তীতে প্রায় ১০ লাখ কপি বিক্রি হয়। এই আইনি জয় শুধু গিন্সবার্গ বা বিট জেনারেশনের জ্যাক কেরুয়াক ও উইলিয়াম এস বারোজের লেখার পথই মসৃণ করেনি, বরং ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’, ‘ট্রপিক অব ক্যান্সার’ এবং ১৯৬২ সালে প্রকাশিত বারোজের ‘নেকেড লাঞ্চ’-এর মতো নিষিদ্ধ বইগুলোর মুক্তির পথও খুলে দেয়। হলিউড থেকে শুরু করে ষাটের দশকের হিপ্পি আন্দোলন ও বব ডিলানের মতো সংগীতশিল্পীদের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়েছিল। ১৯৬৯ সালে ‘শিকাগো সেভেন’-এর বিচারে সাক্ষী হিসেবে অংশ নিয়ে আদালতে এই কবিতার অংশবিশেষ পাঠ করেছিলেন গিন্সবার্গ। দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও ‘হাউল’ আজও রাষ্ট্র ও সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নীরবতার বিরুদ্ধে এক জীবন্ত কণ্ঠস্বর হিসেবে টিকে রয়েছে। কবির সেই বার্তা আজও সত্য—কাউকে চুপ করাতে হলে প্রথমে তার শব্দকে হত্যা করতে হয়, আর শব্দকে হত্যা করার চেষ্টা প্রমাণ করে মানুষ এখনো বেঁচে আছে এবং লড়াই করছে।





























