আওয়ামী লীগের আদর্শিক বিচ্যুতি ও তৃণমূলের পুনর্জাগরণের প্রয়োজনীয়তা
- আপডেট সময় : ০৯:৩০:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম মূলনীতি হলো 'গণতন্ত্র', যা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও মূল আদর্শ। দলটির গঠনতন্ত্রের '২(ঘ)' বিধি অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে, বিশেষত আশির দশক থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। অগণতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচনকালীন 'নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার' ব্যবস্থা প্রবর্তন ছিল আওয়ামী লীগেরই দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল। ২০০১ সালে দলটি শান্তিপূর্ণভাবে সাংবিধানিক উপায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র ঘটনা।
তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। দলটিকে তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পুনরায় প্রবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলো গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে 'অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য' হয়নি বলে সমালোচিত হয়েছে। এমনকি বহু ক্ষেত্রে নির্বাচনি রায় ব্যতীত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সেই সময়ে 'পূর্ণমাত্রায় প্রয়োজনীয় দূরদর্শিতা' দেখাতে পেরেছিল কিনা, তা আজকের সময়ে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
আওয়ামী লীগ কোনো 'আদর্শ বিবর্জিত' দল বা জনবিচ্ছিন্ন কোনো 'গোষ্ঠী' নয়, বরং এটি এদেশের গণমানুষের দল। তবে ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তৃণমূলের মতামতকে 'সুকৌশলে' অবজ্ঞা করা হয়েছে কিনা, তা ভাববার অবকাশ রয়েছে। তৃণমূলের ভাবনা বা কোনো পর্যায়ে আলোচনা, যুক্তি, বিতর্ক ও মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলকে অবহেলা করার খেসারত আজ দলকে দিতে হচ্ছে কিনা, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে, আদর্শের প্রতি বলিষ্ঠতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হলে যেকোনো রাজনৈতিক দল ক্রমান্বয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই অতীত কৃতকর্মের ভুল-ত্রুটি পর্যালোচনা করে, গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়াই এখন দলটির জন্য অত্যাবশ্যকীয় পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আগামী নভেম্বর মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আওয়ামী লীগের জন্য উক্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ হবে জনগণকে আরো কাছে টানার এবং জনগণের সাথে মরচে ধরা সম্পর্ককে টেকসই রাজনৈতিক সম্পর্কে রূপান্তরিত করার এক সুবর্ণ সুযোগ। পূর্বের সকল ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নের মতো, এবারও তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই হবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণের পথপ্রদর্শক ও নতুন পথের দিশারী। এর মাধ্যমেই দেশের প্রতিটি ঘরে আওয়ামী লীগ পুনরায় আদর্শিক রাজনীতির চূড়ান্ত ভরসাস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আওয়ামী লীগ 'আদর্শ বিবর্জিত' কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা জনবিচ্ছিন্ন কোনো 'গোষ্ঠী' নয়। আওয়ামী লীগ এদেশের গণমানুষের দল। এই দলে দীর্ঘ সময় ধরে (বিশেষত ২০১১-২০২৪ সময়ে) সকল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তৃণমূলের মতামতকে 'সুকৌশলে' অবজ্ঞা করা হয়েছে কিনা, সেটা ভাববার অবকাশ আছে বৈকি! কিংবা কোনো পর্যায়ে কোনো ধরনের আলোচনা, যুক্তি, বিতর্ক, মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলকে অবহেলা করার খেসারত আজ দলকে দিতে হচ্ছে কিনা? অথবা তৃণমূলের ভাবনাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়াটা কি আওয়ামী লীগকে গণতান্ত্রিক আদর্শ হতে বিচ্যুত করেছিল কিনা, তা-ও পর্যালোচনার দাবি রাখে!




























