ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন: কেন জটিল হচ্ছে দুই প্রতিবেশীর কূটনৈতিক সমীকরণ
- আপডেট সময় : ০৩:৩৬:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি কঠিন সময় পার করছে। বছরের শুরুতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সম্পর্কের উন্নতির আশা জাগলেও, বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর এবং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে তার অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও, শেষ পর্যন্ত তা থমকে গেছে। ঢাকায় ভারতের নতুন দূত দিনেশ ত্রিবেদী ১০ আগস্ট তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করার পর দ্রুত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রত্যাশা থাকলেও, বর্তমানে তা আর এগোয়নি। এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না থাকলেও ধারণা করা যায়, ইতিবাচক আলোচনা সত্ত্বেও সফর আয়োজনের জন্য সম্ভবত কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে। ভারত সেসব শর্ত প্রত্যাখ্যান করায় বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অনুকূল পরিবেশ না থাকায় এই মুহূর্তে দ্বিপক্ষীয় সফর সম্ভব নয়। কয়েকটি দীর্ঘস্থায়ী বিরক্তির বিষয় থাকলেও ভারত ও বাংলাদেশকে তখনও ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে কাজ করতে দেখা গেছে।
দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান বিরোধের জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় এবং সেখানে অবস্থান করে তার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদান। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুষ্ঠান বন্ধের অনুরোধ জানালেও তা কার্যকর হয়নি, যা সরকারের ক্ষোভের কারণ হয়েছে। এর পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি এবং ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তরের বিষয়টিও ঢাকা সামনে এনেছে। অন্যদিকে নয়াদিল্লি দাবি করেছে, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন, যেখানে ভারত সরকারের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। তবে এই ব্যাখ্যা ঢাকাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। শেখ হাসিনা মামলার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও বারবার দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যদিও আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা অনিশ্চিত।
একই সঙ্গে এটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই যে বিভিন্ন বহিরাগত শক্তি, বিশেষ করে চীন, দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রনীতির হিসাব-নিকাশে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৭০টিরও বেশি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বা সহযোগিতার কাঠামো রয়েছে। আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্বহীন অবস্থা এবং শেখ হাসিনার ফিরে আসার বিষয়টি দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙা করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএনপি সরকারও এক ধরণের রাজনৈতিক দ্বিধায় রয়েছে। একদিকে জামায়াতের মতো ডানপন্থী শক্তির প্রভাব মোকাবিলায় মধ্যপন্থী শক্তির ঐক্য প্রয়োজন, অন্যদিকে শেখ হাসিনার বিষয়ে জামায়াত ও এনসিপির কঠোর অবস্থান সমঝোতার পথকে প্রায় রুদ্ধ করে দিয়েছে। তবে পর্দার আড়ালে কোনো মধ্যস্থতায় বিএনপিকে নমনীয় করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক সূচক বা বাণিজ্যের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়; এর ভিত্তি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় প্রোথিত। বর্তমানে সীমান্তজুড়ে ‘পুশব্যাক’ ও ‘পুশ-ইন’-এর নীতি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ঢাকার নতুন কূটনৈতিক যোগাযোগ অবিশ্বাসকে গভীর করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, কোনো পক্ষই সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করতে পারে না। বাংলাদেশের জন্য ভারত এবং ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলের জন্য বাংলাদেশ অপরিহার্য। এই অচলাবস্থা ভাঙতে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে দ্রুত আলোচনা হওয়া এখন সময়ের দাবি, কারণ বিকল্প কোনো পথই দীর্ঘমেয়াদে সুখকর নয়।


























