বন্যা মোকাবিলায় প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ টেকসই উন্নয়নের আহ্বান

- আপডেট সময় : ০৬:৫৮:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পাশাপাশি অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী-খাল-জলাশয় দখল, পাহাড় কাটা এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্মিলিত ফল। তাই শুধু ত্রাণ কার্যক্রম নয়, বন্যার মূল কারণ নিরসনে বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিবেশসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)। শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘সাম্প্রতিক বন্যার তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ধরা’র সহ-আহ্বায়ক এম. এস. সিদ্দিকী। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের সদস্য সচিব শরীফ জামিল এবং সঞ্চালনা করেন রিভার বাংলা সম্পাদক ও ধরা’র সদস্য ফয়সাল আহমেদ। সভাপতির বক্তব্যে এম. এস. সিদ্দিকী বলেন, সাম্প্রতিক বন্যার ভয়াবহতা শুধু প্রাকৃতিক কারণে নয়। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী-খাল ভরাট, পানি প্রবাহে বাধা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে পরিস্থিতি প্রকট হয়েছে। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ের তথ্য, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা এবং ৬ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত প্রকাশিত পাঁচটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ধরা একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তিনি বন্যা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
মূল প্রবন্ধে শরীফ জামিল জানান, চলতি বছরের ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা অতি ভারী বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির ফলে দেশের অন্তত ১৭টি জেলা ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। এতে ১০ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে প্রায় ৬ লাখ, কক্সবাজারে ১ লাখ ৫৮ হাজার, রাঙামাটিতে ১ লাখ ৮ হাজার, বান্দরবানে ৮৩ হাজার ৫০০ এবং কুড়িগ্রামে ১ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশাপাশি হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি, অসংখ্য মাছের ঘের, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শরীফ জামিল দাবি করেন, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় সংঘটিত বন্যা ও জলাবদ্ধতার বড় অংশের জন্য চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণে অপরিকল্পিত অবকাঠামো দায়ী। তিনি নদী অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা, আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দ্রুত পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
হাওর রক্ষায় আমরা-ধরা’র আহ্বায়ক জাফর সিদ্দিক বলেন, বন্যা বাংলাদেশে নতুন কোনো দুর্যোগ নয়; তবে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত প্রস্তুতি, দ্রুত লজিস্টিক সহায়তা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ধরা’র সদস্য ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, চুনতি রক্ষা আন্দোলন-ধরা’র সমন্বয়ক সানজিদা রহমান এবং কক্সবাজার ধরা’র সহ-আহ্বায়ক এইচ. এম. ফরিদুল আলম শাহীন।
এইচ. এম. ফরিদুল আলম শাহীন কক্সবাজার জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, পাহাড় কাটা, বৃক্ষনিধন ও বালু উত্তোলনের কারণে নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বন্যার পানি দ্রুত নামতে পারছে না। এছাড়া ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং একচেটিয়া চিংড়ি চাষ দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মাতামুহুরী ধরা’র সদস্য বদরুননাহার কলিও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতি নদী অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।



























